বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাত আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা খেলাপি ঋণের বোঝা এখন শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে না, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাকেও নাড়া দিচ্ছে।
ঋণ বিতরণে অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তি এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও তারল্য সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বছরের পর বছর আদায়ের বাইরে থেকে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দেশের ব্যাংক খাত কি ধীরে ধীরে আস্থার সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে? বর্তমান বাস্তবতায় খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, এর কারণ, অর্থনীতির ওপর প্রভাব এবং উত্তরণের সম্ভাব্য পথ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক জটিল ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২.২৬ শতাংশ। এত উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন খেলাপি ঋণের পাশাপাশি অবলোপন (রাইট-অফ) এবং পুনর্গঠিত ঋণের হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ তিন ধরনের ঋণ মিলিয়ে ব্যাংক খাতের মোট দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর ঋণপোর্টফোলিওর একটি বড় অংশ এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে, যা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে নিজেদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই এখন ব্যাংকে রাখা অর্থের সুরক্ষা ও প্রয়োজনের সময় তা উত্তোলনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এই সংকটের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতীতে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান না হয়ে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বড় আকার ধারণ করেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির ঘটনা। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ বের করে বিদেশে পাচারের অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এসেছে, যা আর্থিক খাতের প্রতি জনসাধারণের বিশ্বাসকে আরও দুর্বল করেছে। এর পাশাপাশি কার্যকর তদারকির অভাব এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে অনেক অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই অদৃশ্য থেকে গেছে। সমালোচকদের মতে, অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও কঠোরতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি, ফলে প্রকৃত ঝুঁকির চিত্রও অনেক সময় আড়ালে থেকে গেছে।
খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপের ফলে অনেক ব্যাংক মূলধন ও তারল্য সংকটে পড়েছে। প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে তাদের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা প্রদানের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটের কারণে গভীর আস্থার সংকটে নিমজ্জিত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল তদারকি, ঋণ অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট এই সংকট এখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একাধিক সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ)’ কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণের জন্য জাতীয় বাজেটে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তারল্য সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে কিছু দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ করতে হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সাময়িক সহায়তা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে তদারকি ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করতে পারে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা এবং একটি শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী দেউলিয়া আইন (ব্যাংকরাপ্সি ল) বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এ ছাড়া ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আত্মসাৎকৃত বা বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে শুধু আর্থিক সংকটেই ফেলেনি, বরং জনআস্থার ভিত্তিকেও দুর্বল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাময়িক পদক্ষেপের পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহিতা, কার্যকর ঋণ আদায় ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনের সমান প্রয়োগ এবং সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।

