বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব এখন এক জটিল সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আস্থার সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতি মুদ্রানীতির কার্যকারিতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এতে পরিবর্তন আনা হয়।
গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত মনিটারি পলিসি কমিটির বৈঠকে রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ২ আগস্ট ২০২৬ থেকে রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জরুরি তারল্য সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি বা এসএলএফের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফের হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সুদহারে এই পরিবর্তনকে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, আর্থিক বাজারের তারল্য পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তবে রেপো রেট কমানোর সুফল কতটা বাস্তবে অর্থনীতিতে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ ও অর্থায়নের ব্যয় কতটা সমন্বয় করে এবং উৎপাদনশীল খাতে নতুন অর্থায়ন কতটা বাড়ে তার ওপর।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের মূল্যায়নেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত মুদ্রানীতি শিথিল করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদহার ধরে রাখারও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। সুদের হার কমলে ঋণ ও অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে, বিনিয়োগে গতি আসতে পারে এবং ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে অতিরিক্ত চাহিদা আবার দাম বাড়ার চাপ তৈরি করতে পারে। বিপরীতে সুদহার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ব্যবসার মূলধন ব্যয় বাড়ে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির প্রকৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু অতিরিক্ত চাহিদার ফল নয়। খাদ্য সরবরাহের দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, জ্বালানি ও ইউটিলিটি ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাও মূল্যস্ফীতির বড় চালক। ফলে সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানো গেলেও সরবরাহপক্ষের এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি অপরিহার্য হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়।
আধুনিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার পরিবর্তন করলে তার প্রভাব প্রথমে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় ও ঋণের সুদহারে পড়ে। এরপর বিনিয়োগ, ভোগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব বিস্তার করে। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই মুদ্রানীতির সঞ্চারণ বা মনিটারি পলিসি ট্রান্সমিশন।
বাংলাদেশে এই সঞ্চারণ ব্যবস্থার পথে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অতীতের প্রশাসনিক সুদহার নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যালান্সশিট এবং ঋণবাজারে অসম প্রতিযোগিতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত সব ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার কাছে একই গতিতে পৌঁছায় না।
সমস্যা আরও গভীর হয় যখন কোনো ব্যাংক নিজেই আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপুল খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংক নতুন ঋণ সম্প্রসারণের পরিবর্তে তারল্য সংরক্ষণ এবং নিজেদের ব্যালান্সশিট রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। ফলে নীতি সুদহারে পরিবর্তন এলেও ঋণবাজারে তার প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
এ কারণেই মুদ্রানীতির কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রেপো রেট কত শতাংশ—তা দেখলে হবে না; দেখতে হবে সেই নীতির সংকেত ব্যাংক, ঋণগ্রহীতা ও বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। ২০২৬ সালের মার্চে তা কিছুটা কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হওয়া একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র নয়। এর প্রভাব শুধু ব্যাংকের মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মূলধন, ঋণদানের সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ যাচাই, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ এবং অনিয়মিত পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি এই সংকটকে গভীর করেছে। তাই বর্তমান খেলাপি ঋণের পুরো বিষয়টিকে নিছক ব্যবসায়িক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে।
এখানে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং সাময়িক ব্যবসায়িক সংকটে পড়া উদ্যোক্তার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা জরুরি। প্রকৃত উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে বারবার ছাড় দিলে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি দুর্বল হবে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়বে।
খেলাপি ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন দুর্বলতা। বাসেল-৩ কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা শুধু ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার যুক্ত হওয়ায় প্রয়োজনীয় মোট মূলধন সংরক্ষণের মাত্রা দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে কোনো ব্যাংক সম্ভাব্য ঋণক্ষতি শোষণ করার সক্ষমতা হারায়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে চাইলেও দুর্বল ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হতে পারে।
এখানেই মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সরাসরি টানাপোড়েন তৈরি হয়। একই সুদহার শক্তিশালী ব্যাংকের জন্য এক ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে, আবার অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ একই মুদ্রানীতি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একই ফল দেয় না।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আরেকটি জটিলতা হলো তারল্যের অসম বণ্টন। কিছু দুর্বল ব্যাংক আমানত প্রত্যাহার ও আস্থার সংকটে তারল্যচাপে রয়েছে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি কমানোর কারণে ঋণ বিতরণে সতর্ক হয়ে পড়তে পারে।
ফলে অর্থনীতিতে ঋণের প্রয়োজন থাকলেও ব্যাংকের অর্থ সবসময় উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ঋণের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমানতকারীদের আস্থার প্রশ্ন। কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে গ্রাহক আমানত তুলে নগদ অর্থ ধরে রাখতে পারেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়লে আর্থিক মধ্যস্থতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয় এবং ব্যাংকের ঋণ সৃষ্টির সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মুদ্রানীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের ব্যাংকঋণ। ২০২৬ সালের মে শেষে ব্রড মানি বা ব্যাপক অর্থের সরবরাহ বছরে ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ঋণ বৃদ্ধিতে সরকারি খাতের সম্প্রসারণের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
সরকার যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ধার করে, তখন সীমিত ব্যাংকযোগ্য তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়।
২০২৬ সালের মে শেষে সরকারি খাতে ঋণ বছরে ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এই ব্যবধান দেখিয়ে দেয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঋণপ্রবাহে সরকারি খাতের চাহিদা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই মুদ্রানীতি কার্যকর করতে রাজস্বনীতি ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকেও একই নীতিগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, অথচ সরকারের ব্যাংকঋণের চাহিদা অন্যদিকে দ্রুত বাড়বে—এভাবে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমায়, উচ্চ সুদহার ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং দুর্বল ব্যাংক ঋণপ্রবাহ সীমিত করে। এই তিনটি চাপ একসঙ্গে অর্থনীতির উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণশর্তে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়, যা আবার মানুষের আয় ও ভোগক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। এর অর্থ নির্বিচারে সুদ কমানো নয়; বরং উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং অনুৎপাদনশীল, অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্পর্কভিত্তিক ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের স্বাধীন মূল্যায়ন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমানো, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা তুলে ধরতে আইএফআরএস-৯ বা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড-৯-এর আওতায় এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস বা ইসিএল পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতিতে কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার পর ক্ষতি হিসাব করার পরিবর্তে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ঋণক্ষতির ঝুঁকি আগেই মূল্যায়ন করা হয়। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা সঞ্চিতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ক্ষতির একটি বাস্তবসম্মত চিত্র উঠে আসে এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের কাছে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতাও বাড়ে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ঋণক্ষতির জন্য আগাম প্রস্তুতি থাকায় আকস্মিক বড় আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ে এবং মূলধন সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল খেলাপি ঋণ ও সম্পদের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তাই আইএফআরএস-৯ ও ইসিএলভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন শুধু হিসাবরক্ষণগত সংস্কার নয়; এটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য নিরূপণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। হিসাবের দুর্বলতা আড়াল করে কৃত্রিমভাবে কোনো ব্যাংককে সুস্থ দেখানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃমূলধনীকরণ, একীভূতকরণ, পুনর্গঠন অথবা সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভালো ও খারাপ সম্পদ আলাদা করার জন্য কার্যকর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কাঠামোও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যাংক রেজুলেশন ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি অনিয়মকারী মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়ও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে রক্ষা করার নামে বারবার জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে নৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়বে।
চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতির সরবরাহজনিত কারণ মোকাবিলা ছাড়া শুধু সুদের হার ব্যবহার করে স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে বিনিময় হার ব্যবস্থায় বাজারভিত্তিক ও নমনীয় নীতি বজায় রেখে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আস্থা বাড়াতে হবে। আমদানি ব্যয় ও বিনিময় হারের চাপ মোকাবিলায় রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও হতে হবে সতর্ক, স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক।
নগদনির্ভরতার পরিবর্তে আন্তঃব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা হলে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থের প্রবাহও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের মুদ্রানীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দুর্বল ব্যাংক, বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং ঋণ অনিয়মের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে নীতি সুদহার যতই পরিবর্তন করা হোক, তার সুফল অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে পৌঁছানো কঠিন হবে।
তাই আগামী দিনের মুদ্রানীতিকে শুধু ‘কঠোর’ অথবা ‘নমনীয়’ হিসেবে মূল্যায়ন করলে চলবে না। দেখতে হবে নীতির সঞ্চারণ কতটা কার্যকর, ব্যাংকিং খাত কতটা সক্ষম, ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির সরবরাহজনিত কারণগুলো কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও ব্যাংকিং সংস্কারকে পৃথক তিনটি নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একই সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরস্পরনির্ভর অংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানো—সবকিছুকে একই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে।
ক্ষতবিক্ষত ব্যাংকিং খাতের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছানো যাবে না। মুদ্রানীতির প্রকৃত কার্যকারিতা তখনই ফিরবে, যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আর্থিকভাবে সক্ষম। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ সুদের হার নিয়ে এককেন্দ্রিক নীতি নয়; বরং আর্থিক খাতে আস্থা পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং মুদ্রা, রাজস্ব ও সরবরাহনীতির কার্যকর সমন্বয়। এ পথেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

