Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice রবি, আগস্ট 23, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » হুন্ডি প্রতিরোধ এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যুগোপযোগী কৌশল
    সম্পাদকীয়

    হুন্ডি প্রতিরোধ এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যুগোপযোগী কৌশল

    নিউজ ডেস্কআগস্ট 22, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স। রপ্তানি আয়ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস। এই দুই প্রবাহ দেশের আমদানি সক্ষমতা, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিটি বৈধ প্রবাহকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা এখন অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বৈধ পথে দেশে এসেছে প্রায় ২.৮৬ বিলিয়ন ডলার বা ২,৮৫৯ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫.৪ শতাংশ বেশি। এতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

    রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬.৪২ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে তা ছিল ৩১.৬০ বিলিয়ন ডলার।
    ২০ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭.৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৩৭ হাজার ৩৩২.৮৯ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ৩২.৫৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩২ হাজার ৫৩২.৮৯ মিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের এই বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    তবে এই ইতিবাচক ধারাকে টেকসই করতে হলে হুন্ডিসহ সব ধরনের অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ মোকাবিলা করতে হবে। শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়, ব্যাংকিং চ্যানেলকে এমন দ্রুত, সহজ, নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে, যাতে প্রবাসীর কাছে বৈধ পথই স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে ওঠে।

    হুন্ডি মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের একটি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ পদ্ধতি। প্রচলিত ব্যবস্থায় বিদেশে প্রবাসীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে দেশের কোনো ব্যক্তি বা নেটওয়ার্ক স্থানীয় মুদ্রায় তার পরিবারকে অর্থ দিয়ে দেয়। ফলে বিদেশে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেওয়া হয়, তা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে না-ও আসতে পারে।

    এই কারণে হুন্ডির প্রভাব শুধু একটি অবৈধ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক সরবরাহ কমাতে পারে, ডলারের বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অর্থপাচার ও কর ফাঁকির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সংগঠিত হুন্ডি নেটওয়ার্ক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ স্থানান্তরেও ব্যবহৃত হতে পারে।

    বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে অবৈধ অর্থপ্রবাহের ধরনও বদলেছে। ডিজিটাল যোগাযোগ, বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যভিত্তিক কারসাজির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ক্রিপ্টোসম্পদ বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমের অপব্যবহার নিয়েও নজরদারি প্রয়োজন। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকে নিজেই হুন্ডির সমার্থক হিসেবে দেখা ঠিক নয়; মূল বিষয় হলো অনুমোদনহীন ও গোপন অর্থপ্রবাহ।

    রিজার্ভের ওপর চাপ: বৈধ পথে দেশে আসার সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ যদি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থাকে, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না।

    বিনিময় হারে অস্থিরতা: ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা তৈরি হলে আনুষ্ঠানিক বাজারের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    অর্থপাচার ও কর ফাঁকির ঝুঁকি: হুন্ডির সঙ্গে অবৈধ সম্পদ স্থানান্তর, কর ফাঁকি এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ গঠনের ঝুঁকি যুক্ত হতে পারে।

    আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন: ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বড় ধরনের অর্থপ্রবাহ তৈরি হলে অর্থনীতিতে প্রকৃত অর্থের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

    হুন্ডির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে বৈধ চ্যানেলকে আরও শক্তিশালী করা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

    অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক অর্থ দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ ও হিসাবে জমা দেওয়ার এই সময়সীমা সংবলিত মূল সার্কুলারটি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি জারি করেছিল। পরবর্তীতে এই নির্দেশ পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোকে ৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত সময়সীমা বা ট্রানজিশন পিরিয়ড বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

    এখানে স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং (এসটিপি) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় তথ্য ও ঝুঁকি মূল্যায়ন সন্তোষজনক হলে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় অর্থ দ্রুত হিসাবে জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় হাতে-হাতে প্রক্রিয়া কমে এবং লেনদেনের সময়ও কমে।

    একই নির্দেশনায় ইউনিক এন্ড-টু-এন্ড ট্রানজেকশন রেফারেন্স (ইউইটিআর)-এর মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন অনুসরণযোগ্য ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টাকা কোথা থেকে এসেছে, কোন পথে এসেছে এবং কোথায় জমা হয়েছে—এসব তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

    এ ধরনের ব্যবস্থা হুন্ডির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ব্যাংকিং চ্যানেলকে শক্তিশালী করতে পারে, কারণ হুন্ডির বড় আকর্ষণ হলো দ্রুততা ও সহজতা।

    প্রবাসী আয় সংগ্রহে ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে ডিজিটাল আর্থিক প্রযুক্তিতে। ব্যাংক, অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং মোবাইল আর্থিক সেবাকে সমন্বিত করা গেলে বিদেশ থেকে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া অনেক সহজ করা সম্ভব।

    একজন প্রবাসী যেন মোবাইল ফোন থেকেই বিনিময় হার জানতে পারেন, সম্ভাব্য খরচ দেখতে পারেন, নিরাপদে অর্থ পাঠাতে পারেন এবং প্রাপক কখন টাকা পেয়েছেন তা তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেন—এমন ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

    এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সংযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে যেকোনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, অর্থপাচারবিরোধী বিধান ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

    হুন্ডি প্রতিরোধের সবচেয়ে বাস্তব কৌশলগুলোর একটি হলো বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর আর্থিক সুবিধা বাড়ানো। একজন প্রবাসী যদি দেখেন, ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠালে বেশি খরচ হচ্ছে বা পরিবার তুলনামূলক কম টাকা পাচ্ছে, তাহলে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।

    তাই ব্যাংক ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের কাছে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে—কত টাকা পাঠানো হয়েছে, কত ফি কাটা হয়েছে, প্রণোদনা কত এবং শেষ পর্যন্ত প্রাপক কত টাকা পাবেন।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত বৈদেশিক মুদ্রার বাজার-তথ্যও দেখাচ্ছে যে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার গুরুত্ব এখন আরও বেড়েছে। তবে ‘হুন্ডি সবসময় ব্যাংকের চেয়ে বেশি দর দেয়’—এমন সার্বজনীন বক্তব্যের পরিবর্তে বলা উচিত, বৈধ চ্যানেলের বিনিময় হার ও মোট প্রাপ্তি যেন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক থাকে। প্রণোদনা থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা কমাতে হবে

    বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে নগদ প্রণোদনা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রণোদনার ওপর নির্ভরশীলতা কাম্য নয়। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দ্রুত সেবা, কম খরচ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার কারণে প্রবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই বৈধ চ্যানেল বেছে নেবেন। অর্থাৎ প্রণোদনা হতে পারে সহায়ক ব্যবস্থা; কিন্তু ভালো সেবাই হতে হবে বৈধ রেমিট্যান্স ব্যবস্থার মূল শক্তি।

    ব্যাংকিং খাতে অভ্যন্তরীণ নজরদারি বাড়াতে হবে। হুন্ডি প্রতিরোধ শুধু সীমান্ত বা বিদেশে থাকা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয় নয়। ব্যাংক, অনুমোদিত এক্সচেঞ্জ হাউস ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

    কোনো কর্মকর্তা বা এজেন্ট যদি অবৈধ অর্থপ্রবাহে সহযোগিতা করেন, তাহলে দ্রুত শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।

    তবে এর অর্থ এই নয় যে সাধারণ গ্রাহকের প্রতিটি লেনদেনকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে। বরং ঝুঁকিভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে প্রকৃত সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করতে হবে।

    আমদানি-রপ্তানিতে কারসাজি ঠেকানো জরুরি। হুন্ডি ও অর্থপাচার প্রতিরোধে শুধু রেমিট্যান্সের দিকে নজর দিলে চলবে না। আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে স্থানান্তরের ঝুঁকি রয়েছে। পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে অর্থ স্থানান্তরের মতো কারসাজি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

    এ জন্য কাস্টমস, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও সরকারি সংস্থার তথ্যভান্ডারের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় বাড়ানো যেতে পারে। পণ্যের মূল্য, লেনদেনের ইতিহাস, আমদানিকারক-রপ্তানিকারকের তথ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের মধ্যে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহার করা সম্ভব। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের অযথা হয়রানি না করে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনকে লক্ষ্যবস্তু করা জরুরি।

    আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান, দেশীয় ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে সংযোগ যত সহজ হবে, বৈধ রেমিট্যান্স তত দ্রুত পৌঁছাবে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা যেতে পারে। এর ফলে বিদেশে থাকা প্রবাসী সহজে অর্থ পাঠাবেন এবং দেশে তার পরিবারের সদস্য ব্যাংক হিসাব বা অনুমোদিত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দ্রুত অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন।

    এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সময় কমানো। তবে গ্রাহকের নিরাপত্তা ও অর্থপাচারবিরোধী বিধান কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না।

    প্রযুক্তিনির্ভর হুন্ডির মোকাবিলায় প্রযুক্তিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, কাস্টমস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময়ের কাঠামো আরও শক্তিশালী করা দরকার।

    একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক লেনদেন, একাধিক হিসাবের মধ্যে অস্বাভাবিক অর্থপ্রবাহ, সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্বাভাবিক নগদ লেনদেন, বাণিজ্যিক তথ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের অসামঞ্জস্য—এসব শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে হুন্ডি চক্রের মূল সংগঠকদের শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও আইনগত অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

    প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের শুধু ‘রেমিট্যান্স প্রেরক’ হিসেবে দেখলে চলবে না। দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে দ্রুত ও সম্মানজনক সেবা, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

    একই সঙ্গে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের নিরাপদ সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ সঞ্চয়পত্র বা বন্ড, আবাসন প্রকল্প, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারে সহজ ও স্বচ্ছ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রবাসী যদি দেখেন যে দেশে তার অর্থ নিরাপদ, বিনিয়োগের পরিবেশ স্বচ্ছ এবং রাষ্ট্র তার অবদানকে সম্মান করে, তাহলে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

    বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, পর্যটন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করতে হবে।

    বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা, প্রযুক্তি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। দক্ষ কর্মীরা তুলনামূলক বেশি আয় করলে একই শ্রমবাজার থেকেই ভবিষ্যতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। হুন্ডি ও অর্থপাচারের সংগঠিত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। অপরাধী চক্র শনাক্ত, অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান, অর্থের গতিপথ অনুসরণ এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু অভিযান ও শাস্তি দিয়ে হুন্ডি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর অর্থনৈতিক কারণও দূর করতে হবে। বৈধ চ্যানেলকে দ্রুত, সহজ, নিরাপদ এবং লাভজনক করলে হুন্ডির বাজার স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হবে।

    সামনে যে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সমন্বিত জাতীয় রেমিট্যান্স কৌশল প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে—

    প্রথমত, প্রবাসীদের জন্য দ্রুত ও কম খরচের ডিজিটাল রেমিট্যান্স ব্যবস্থা।

    দ্বিতীয়ত, বৈধ চ্যানেলের বিনিময় হার ও মোট প্রাপ্তিকে প্রতিযোগিতামূলক রাখা।

    তৃতীয়ত, এসটিপি ও ইউইটিআরের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

    চতুর্থত, ব্যাংক, মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান, ফিনটেক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে নিরাপদ প্রযুক্তিগত সংযোগ বাড়ানো।

    পঞ্চমত, কাস্টমস ও ব্যাংকিং তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার শনাক্ত করা।

    ষষ্ঠত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগঠিত হুন্ডি নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা।

    সপ্তমত, প্রবাসীদের জন্য দেশে নিরাপদ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো।

    সবশেষে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

    হুন্ডি শুধু একটি অবৈধ অর্থ লেনদেনের পদ্ধতি নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহ, আর্থিক স্বচ্ছতা, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এর মোকাবিলায় শুধু কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তি, নীতি, বাজারব্যবস্থা এবং প্রবাসীবান্ধব ব্যাংকিং সেবার সমন্বিত সংস্কার।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড প্রায় ৩৫.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা প্রায় ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ২.৮৫৮ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় একই কার্যদিবসে রেমিট্যান্স জমা, পরবর্তী কার্যদিবসে ব্যাংকিং সময়ের পর পাওয়া অর্থ জমা, স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা এই সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

    এখন প্রয়োজন এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন। বৈধ পথে অর্থ পাঠানো যদি দ্রুততম, সহজতম, স্বচ্ছতম, নিরাপদ এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়, তাহলে হুন্ডির আকর্ষণ অনেকটাই কমে আসবে।

    অতএব, নীতির লক্ষ্য শুধু হুন্ডি বন্ধ করা হওয়া উচিত নয়; বরং এমন একটি আধুনিক আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে একজন প্রবাসী স্বাভাবিকভাবেই মনে করবেন—দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সবচেয়ে নিরাপদ, লাভজনক ও সুবিধাজনক পথই হলো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল।

    এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে রেমিট্যান্স কেবল প্রবাসী পরিবারের আয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার শক্তিশালী ভিত্তি, বিনিয়োগের উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    ব্যাংক

    এসবিএসি ব্যাংকে ঝুঁকি তদারকি নিয়ে কর্মশালা

    আগস্ট 22, 2026
    ব্যাংক

    ইসলামি ব্যাংকগুলোতে কমছে আমানত, কারণ কি?

    আগস্ট 22, 2026
    সম্পাদকীয়

    একজন সাংবাদিকের মৃত্যু, রাষ্ট্রের পরীক্ষা: বিভুরঞ্জনকে ঘিরে উত্তরহীন প্রশ্ন

    আগস্ট 22, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.