কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের বা প্রতিষ্ঠানের শোক নয়, একটি সময়েরও শূন্যতা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। ২ অক্টোবর ২০২৬, ৫৯ বছর বয়সে লন্ডনে ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি মারা গেছেন।
খবরটি শোনার পর প্রথমেই মনে হলো, আমাদের হারানোর তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে, অথচ অনুসরণ করার মতো নতুন মানুষ তৈরি হচ্ছে খুবই কম।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার ব্যক্তিগত পরিচিত ছিলেন না, ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করারও সুযোগ হয়নি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই তাঁকে অনুসরণ করতাম। ভিন্ন পেশার, অচেনা একজন মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন আমার কাছে এক ধরনের আইকন। এই সমস্যাগ্রস্ত দেশে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে কীভাবে একটি জীবন, একটি পেশা ও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, তার বাস্তব উদাহরণ তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন।
২০০৬-এ যে সাহস ইতিহাস হয়ে গেল
আজকের অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিশাল বিস্তার দেখে বোঝা কঠিন, একসময় বাংলাদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ ছিল একেবারেই নতুন ধারণা।
২০০৬ সালে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে বিডিনিউজ নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করে এবং ২৩ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদসেবা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেটিই বাংলাদেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার নতুন যুগের সূচনা।
আজ দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল। মুহূর্তে খবর প্রকাশ হয়, মোবাইল ফোনেই সংবাদ তৈরি হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদপ্রবাহের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ডিজিটাল জগতের বীজ যখন বপন করা হয়েছিল, তখন অনলাইন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো দৃষ্টান্তই ছিল না।
সেই অনিশ্চিত সময়ে নতুন পথ বেছে নেওয়া নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল দূরদৃষ্টি। তৌফিক খালিদী ছিলেন সেই দূরদৃষ্টির মানুষ।
শ্রদ্ধা, তৌফিক ইমরোজ খালিদী। আপনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। আপনার অনুপস্থিতি আজ আমরা অনুভব করছি, আর আপনার কাজের প্রয়োজন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশও অনুভব করবে।
শুধু একটি পোর্টাল নয়, একটি নতুন সাংবাদিকতার সংস্কৃতি
তাঁর বড় কৃতিত্ব শুধু একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা নয়। তিনি এমন একটি সংস্কৃতি গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে দ্রুততার সঙ্গে পেশাদারিত্ব, প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পাদনা, আর তাৎক্ষণিকতার সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা পাশাপাশি চলবে।
তাঁর পেশাগত জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। ডেইলি স্টার ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে কাজ করার পর তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার সেই অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন বাংলাদেশে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম নির্মাণে।
এই জায়গাটিই তাঁকে আমার কাছে আলাদা করে তুলত। তিনি শুধু সংবাদ প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম বানাননি, একটি পেশার ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, তারও একটি মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন।
চুপচাপ মানুষটির কাজ ছিল উচ্চকণ্ঠ
তাঁর ব্যক্তিত্বের যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি টানত, তা তাঁর চুপচাপ স্বভাব। অন্তত জনপরিসরে তাঁকে আমার কখনো বেশি কথার মানুষ মনে হয়নি। কিন্তু তাঁর কাজ ছিল উচ্চকণ্ঠ।
কাজপাগল, সৃষ্টিপাগল একজন মানুষ কীভাবে নিজের চারপাশের বাস্তবতা বদলে দিতে পারেন, তিনি ছিলেন তার উদাহরণ। কাজকে তিনি শুধু পেশা হিসেবে নেননি, দেখেছেন একটি নির্মাণপ্রক্রিয়া হিসেবে। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর চলে যাওয়া শুধু একজন সাংবাদিককে হারানো নয়, একজন স্রষ্টাকে হারানো।
আমাদের সমাজে অনুসরণ করার মতো মানুষ এমনিতেই কম। যাঁরা প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু গড়েন, তাঁরা আরও কম। আর যাঁরা নতুন পথ তৈরি করে অন্যদের হাঁটার সুযোগ করে দেন, তাঁরা আরও বিরল।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়
তাঁর সাংবাদিকতার আরেকটি দিক বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য: মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নথিভুক্ত ও সংরক্ষণে তাঁর ভূমিকা।
যে সময়ে একাত্তর নিয়ে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, বিতর্ক ও বিভ্রান্তি জনপরিসরে জায়গা করে নিচ্ছিল, তখন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস নথিবদ্ধ করার প্রয়োজন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক তিন খণ্ডের বৃহৎ সংকলন প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সমসাময়িক লেখালেখি ও স্মৃতিচারণেও এর গুরুত্ব উঠে এসেছে।
তবে এর তাৎপর্য কয়েকটি বই প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে স্মৃতি, সাক্ষ্য ও দলিল সংরক্ষণ করা সাংবাদিকতারই একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব। তিনি সেই দায়িত্ব বুঝেছিলেন।
কারণ সংবাদ আজকের জন্য লেখা হলেও ভালো সাংবাদিকতা আগামী দিনের ইতিহাসের উপাদান তৈরি করে। সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন ইতিহাসের প্রথম খসড়া লিখে যায়, আর সেই খসড়ার কতটা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে একজন সম্পাদকের দূরদৃষ্টির ওপর।
প্রচলিত পথই একমাত্র পথ নয়
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে তাঁকে অনুসরণ করার আমার ব্যক্তিগত কারণটিও এখানেই। আমরা এমন দেশে বাস করি, যেখানে নিরাপদ পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা প্রবল। সবাই যা করছে, তা করাই সহজ। নতুন কিছু শুরু করা কঠিন, আর সেটিকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন।
তৌফিক খালিদী দেখিয়েছেন, অন্যরকমভাবে ভাবা যায়। একজন সাংবাদিক বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর দেশে ফিরে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাধ্যম নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে পারেন, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন এবং দুই দশক ধরে এগিয়ে নিতে পারেন।
এটি শুধু সাংবাদিকতার গল্প নয়। এটি স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্নের দায়িত্ব নেওয়ার গল্প।
আমরা মানুষ হারাই, প্রতিষ্ঠান গড়ি না
তাঁর মৃত্যু আমাকে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি শুধু ভালো মানুষদের চলে যাওয়ার পর স্মরণ করব, নাকি তাঁদের গড়া মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব?
একজন মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর ছবি বা স্মৃতিচারণ নয়। প্রকৃত উত্তরাধিকার হলো তিনি যে মানদণ্ড তৈরি করে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম তা কতটা ধরে রাখতে পারল।
অনলাইন সাংবাদিকতার যে দরজা তিনি খুলেছিলেন, সেই দরজা দিয়ে আজ অসংখ্য মানুষ পেশায় এসেছেন। এখন দায়িত্ব তাঁদের: দ্রুত সংবাদকে দায়িত্বশীল সংবাদে পরিণত করা, প্রযুক্তিকে সাংবাদিকতার বিকল্প নয়, শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা, আর সংবাদমাধ্যমকে ক্লিক ও ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় আটকে না যেতে দেওয়া।
একজন আইকন চলে গেলেন, পথটি রয়ে গেল
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না, কিন্তু অনুসরণ করতাম। তাঁর চুপচাপ থাকা, কাজের প্রতি অদ্ভুত একাগ্রতা, নতুন কিছু করার সাহস এবং প্রচলিত সীমার বাইরে নিজের জায়গা তৈরি করার ক্ষমতা আমাকে বহুবার অনুপ্রাণিত করেছে। তাই তাঁর চলে যাওয়াকে শুধু একজন প্রধান সম্পাদকের মৃত্যু হিসেবে দেখতে পারছি না।
আমার কাছে এটি এমন একজনের বিদায়, যিনি প্রমাণ করে গেছেন, এই দেশেও নতুন কিছু শুরু করা যায়। এই দেশেও পেশাকে ভালোবেসে প্রতিষ্ঠান গড়া যায়। এই দেশেও নিজের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে যাওয়া যায়।
আমাদের হারানোর তালিকা সত্যিই দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু সৃষ্টিতে আমরা ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হবে শুধু শোক না করে, তাঁর মতো করে নতুন কিছু সৃষ্টির সাহস দেখানো।তিনি চলে গেলেন। কিন্তু যে পথ তিনি তৈরি করে গেছেন, সেই পথে এখন অন্যদের হাঁটতে হবে।
শ্রদ্ধা, তৌফিক ইমরোজ খালিদী। আপনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। আপনার অনুপস্থিতি আজ আমরা অনুভব করছি, আর আপনার কাজের প্রয়োজন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশও অনুভব করবে।

