সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং মানুষের সামনে সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু সেই সাংবাদিকই যদি সংবাদ প্রকাশের কারণে হুমকি, মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ কতটা নিরাপদ?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা এসেছে?
নেত্রকোণার সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ড এই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে। সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান, মাদক ও অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতেন তিনি। হত্যার আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ সুপারের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। এর আগে তাঁর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল। এরপরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রাণ দিতে হলো।
আলিফ হত্যার ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও শুধু সরাসরি হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনলেই চলবে না। হত্যার নেপথ্যে কারা ছিল, কোনো প্রভাবশালী মহল জড়িত কি না, তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে হত্যার যোগসূত্র রয়েছে কি না, সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
সাংবাদিকের পরিচয় কি অপরাধের দায়মুক্তি, নাকি হয়রানির অজুহাত?
সাংবাদিক হলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কাউকে হয়রানি, ঢালাও মামলায় আসামি করা অথবা বিচার শেষ হওয়ার আগেই অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও মামলা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, কারাগারে পাঠানো এবং দীর্ঘদিন আইনি জটিলতায় আটকে রাখার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন হত্যা ও সহিংসতার মামলায় একাধিক সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কিন্তু ঢালাওভাবে আসামি করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া আটক রাখা কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
এখানে মূল প্রশ্ন সাংবাদিকদের দায়মুক্তি নয়, বরং আইনের সমান প্রয়োগ। সাংবাদিকের অপরাধের বিচার যেমন জরুরি, তেমনি সাংবাদিকের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যার বিচারও সমান জরুরি।
ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, সাংবাদিকতার পরিবেশ কি বদলেছে?
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করায় সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী, দখলবাজ ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধেও সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন।
বর্তমান বাস্তবতায় এসব ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহনন। কোনো সাংবাদিক দুর্নীতি বা অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করলেই তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার প্রবণতা দেখা যায়।
এমন পরিবেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কীভাবে বিকশিত হবে? একজন সাংবাদিক যদি জানেন, একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁর চাকরি, স্বাধীনতা কিংবা জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তাহলে তিনি কতটা নির্ভয়ে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে লিখবেন?

গণমাধ্যম সরকারের প্রচারযন্ত্র নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্রও নয়। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা যেমন সাংবাদিকতার অংশ, তেমনি ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের সমালোচনা করাও তার দায়িত্ব। গণমাধ্যমের কাজ ক্ষমতাকে খুশি রাখা নয়, বরং জবাবদিহির মধ্যে রাখা।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা এই সাংবিধানিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংবাদিকদের কণ্ঠ রুদ্ধ হলে শুধু একটি পেশা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, সাধারণ মানুষের জানার অধিকারও সংকুচিত হয়।
অবশ্য সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি পেশাগত সততা ও দায়বদ্ধতাও জরুরি। অপসাংবাদিকতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ কিংবা তথ্য যাচাই না করে প্রতিবেদন প্রকাশের দায় গণমাধ্যমকেও নিতে হবে। তবে এর প্রতিকার হতে হবে আইনসম্মত পথে, হামলা, হুমকি কিংবা প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়।
নিরাপদ সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই আলিফ হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী ও অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করতে হবে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি না থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় সেগুলোর নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দ্রুত মামলা গ্রহণ ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যেন হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের শক্তি
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু বিরোধী মত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতায় নয়, বরং সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়।
নেত্রকোণার আলিফের মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে হারিয়ে না যায়। তাঁর হত্যার বিচার, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার পর্যালোচনা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দিলে দুর্নীতি থেমে যায় না, অপরাধ আড়াল করলেও অপরাধীর অস্তিত্ব মুছে যায় না। বরং সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ হলে অন্ধকার আরও গভীর হয়।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ পেশাজীবী গোষ্ঠীর সুবিধা নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।

