ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নিবন্ধনহীন, অনুমোদনহীন এবং অনেক ক্ষেত্রে চলাচলের অনুপযোগী এসব যানবাহন গত এক দশকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু রাজধানীতেই এ ধরনের রিকশার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। সারা দেশে সংখ্যাটি ৪০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে সরকার প্রধান সড়কে এসব যানবাহন চলাচল বন্ধের উদ্যোগ নিলেও চালকদের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে। এবার নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় এনে যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে নতুন বিধিমালা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৬ সালের ব্যাটারিচালিত ধীরগতির তিন চাকার যান বা ই-রিকশা চলাচলসংক্রান্ত বিধিমালা বৃহস্পতিবার সরকারি গেজেটে প্রকাশ করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ই-রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রতিটি যানবাহনে স্বতন্ত্র নম্বর এবং দ্রুত শনাক্ত করার জন্য বিশেষ সংকেতযুক্ত নম্বরপ্লেট থাকতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, যে সিটি করপোরেশনে কোনো ই-রিকশা নিবন্ধিত হবে, সেটি অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালসড়ক, বাসের জন্য নির্ধারিত দ্রুতগতির চলাচলপথ এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ সড়কেও এসব যান চলাচল করতে পারবে না। তবে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কগুলোতে ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি থাকবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। রাজধানীর যানজট বাড়ার পেছনে প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল অন্যতম কারণ। তাই কোন সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করে না দিলে নতুন বিধিমালার সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
পুরোনো রিকশার মান নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে বর্তমানে চলাচল করা বিপুলসংখ্যক ই-রিকশাকে নির্ধারিত নিরাপত্তামানের আওতায় আনা। বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি যানবাহনকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত কারিগরি নকশা ও মানদণ্ড অনুসরণ করে ফিটনেস সনদ নিতে হবে। পুরোনো ই-রিকশাগুলোকেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব শর্ত পূরণ করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে চলাচল করা অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা বিশেষজ্ঞদের তৈরি অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। অনেক যানবাহন স্থানীয়ভাবে অদক্ষ কারিগরদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। ফলে এগুলোর ভারসাম্য, কাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় নানা ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এসব পুরোনো যানবাহন পরিবর্তন করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত মানে আনা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
যেসব যানবাহন নির্ধারিত মান পূরণ করতে পারবে না, সেগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়েও বিধিমালায় পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই। শুধু নিবন্ধন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বিপুলসংখ্যক চালক তাঁদের জীবিকার মাধ্যম হারাতে পারেন। এতে নতুন করে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ কারণে পুরোনো ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের মালিকদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিবর্তন পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। সহজ শর্তে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে তাঁদের অনুমোদিত নকশায় তৈরি নতুন ই-রিকশা কেনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একদিকে চালকদের জীবিকা রক্ষা হবে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে অনিরাপদ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব হবে।
বিধিমালার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন
ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ যে নিয়ম প্রকাশ করেছে, সেটি সরকারি নীতিমালার কাঠামোয় তৈরি হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ আইন হিসেবে নয়। অথচ কোনো নীতিমালা দিয়ে আইনের বিকল্প তৈরি করা যায় না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনগুলো রিকশার মতো যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষমতা রাখলেও মোটরচালিত যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশনগুলোকে মোটরচালিত যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষমতা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট আইন আগে সংশোধন করা প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে মোটরযান আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এসব যানবাহনও মোটরের সাহায্যে চলে।
যে পথেই সরকার এগোক না কেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও শুধু বিধিমালা প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রধান সড়কে চলাচলের সীমা নির্ধারণ, পুরোনো যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চালকদের জীবিকার সুরক্ষা এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নতুন নিয়মও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

