গণতন্ত্রের সবচেয়ে প্রচলিত অর্থ হলো জনগণের শাসন। একজন নাগরিকের একটি ভোট। ধনী-গরিব, কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী- সবার ভোটের মূল্য সমান। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেবেন এবং সেই প্রতিনিধিরাই সংসদে গিয়ে দেশের আইন তৈরি করবেন। শুনতে ব্যবস্থাটি খুবই সহজ ও সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্নটা এত সহজ নয়।
তাহলে, ভোট দেওয়ার অধিকার সবার জন্য সমান হলেও প্রার্থী হওয়া, নির্বাচনী প্রচার চালানো এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সেই সমতা কতটা বজায় থাকে? আর নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিরা আসলে কার কাছে বেশি জবাবদিহিতা করেন?- জনগণের কাছে, নাকি দল, অর্থ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে?
এই প্রশ্নগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
২০২৬ সালের ১৩তম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত ২৯৭ জন সদস্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ১৭৪ জনের পেশা ব্যবসা। অর্থাৎ প্রায় ৫৯ শতাংশ সংসদ সদস্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা আগের সংসদের তুলনায় কিছুটা কম হলেও এখনও সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে টিআইবির তথ্য বলছে, নতুন সংসদের ২৩৬ জন সদস্য কোটিপতি, যা মোট সদস্যের প্রায় ৮০ শতাংশ।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের আইন ও নীতি তৈরি করছেন সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সংসদে ব্যবসায়ী থাকা কোনো সমস্যা নয়। ব্যবসায়ীরাও দেশের নাগরিক এবং তাদেরও রাজনীতি করার ও নির্বাচিত হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। বরং একজন ব্যবসায়ীর অর্থনীতি, শিল্প, বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। যদি সংসদে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের সংখ্যা এতটাই বেশি হয়ে যায় যে, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ কিংবা অন্যান্য পেশার প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কমে যায়, তখন গভীরভাবে প্রশ্ন ওঠে, জাতীয় সংসদ কি পুরো সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে?
কারণ সংসদে যে আইন তৈরি হয়, তার প্রভাব কিন্তু সবার ওপর পড়ে। কৃষকের জন্য কৃষিনীতি, শ্রমিকের জন্য শ্রম আইন, সাধারণ মানুষের জন্য কর ও মূল্যনীতি, ব্যবসায়ীদের জন্য শিল্প ও বিনিয়োগনীতি, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা আইন- সবই সংসদে তৈরি বা অনুমোদিত হয়। তাই যাদের জীবনযাপন, আয় ও পেশা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ যদি সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের দিকে বেশি ঝুঁকে যায়, তাহলে অন্য শ্রেণির সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থাকবেই।
আর এখানেই আসে টাকার প্রশ্ন। একজন সাধারণ মানুষ আইনগতভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। কোনো আইনে বলা নেই যে একজন কৃষক, শিক্ষক বা শ্রমিক নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার খরচ কতজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব? টিআইবির ২০২৬ সালের নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে ৭০টি আসনের তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রমের ব্যাপক চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যয়সীমা অতিক্রমকারী প্রার্থীদের গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সবার প্রার্থী হওয়ার অধিকার থাকলেও বাস্তব নির্বাচনী মাঠে অর্থনৈতিক সামর্থ্য বড় একটি পার্থক্য তৈরি করে।
তাহলে কৃষকদের প্রতিনিধি বা স্কুলশিক্ষক যদি নির্বাচন করতে চান, তার সামনে কী দাঁড়ায়? তাকে প্রচারণা চালাতে হবে, কর্মী সংগঠিত করতে হবে, নির্বাচনী এলাকায় মানুষের কাছে যেতে হবে, পরিবহন ও প্রচারব্যয় বহন করতে হবে। এসবের জন্য যদি কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ প্রয়োজন হয়, তাহলে কেবল আইনগত অধিকার থাকলেই কি নির্বাচন সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার জায়গা থাকে? এখানেই গণতন্ত্রের একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই সমান, কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বাস্তব সক্ষমতা সবার সমান নয়।
বাংলাদেশের সংসদে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসও এই পরিবর্তনটি বোঝায়। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে ব্যবসায়ী সদস্য ছিলেন তুলনামূলকভাবে কম। এরপর ১৯৯১ সালে তাদের অংশ ৩৮ শতাংশে, ২০১৮ সালে ৬২ শতাংশে এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৬৭ শতাংশে পৌঁছে যায়। ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ৫৯ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশের সংসদে ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক দল বদলেছে, সামরিক শাসন এসেছে, গণআন্দোলন হয়েছে, নির্বাচনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু রাজনীতিতে অর্থ ও ব্যবসায়িক শ্রেণির প্রভাবের প্রবণতা পুরোপুরি এখনও বদলায়নি।
এর কারণ কী?
শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করলেই কি উত্তর পাওয়া যাবে? আসলে বিষয়টি আরও গভীর। একটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য শুধু ভোটারদের সমর্থন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দলীয় মনোনয়ন, সংগঠন, প্রচারণা, অর্থ এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সক্ষমতা। ফলে যার অর্থনৈতিক সামর্থ্য বেশি, তার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগও অনেক সময় বেশি হয়। ধীরে ধীরে রাজনীতিতে অর্থের গুরুত্ব বাড়তে থাকলে সাধারণ পেশার মানুষ রাজনীতিতে আসার আগেই পিছিয়ে পড়েন।
সব থেকে বেশি আলোচনায় আসে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি। একজন সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে তিনি আবার প্রার্থী হতে পারবেন কি না, সেটি অনেকাংশে নির্ভর করে দলীয় মনোনয়নের ওপর। ফলে একজন জনপ্রতিনিধির সামনে একদিকে থাকে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা, অন্যদিকে থাকে দলের নেতৃত্বের প্রত্যাশা। আদর্শ পরিস্থিতিতে একজন এমপির প্রধান জবাবদিহিতার জায়গা হওয়া উচিত জনগণের কাছে। কিন্তু বাস্তবে যদি দলীয় মনোনয়ন হারানোর ভয় তার সিদ্ধান্তকে বেশি প্রভাবিত করে, তাহলে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে দলীয় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়। ভারতের ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলও একই ধরনের একটি প্রবণতা দেখিয়েছে। ৫৪৩ জন বিজয়ীর মধ্যে ৫০৪ জনের ঘোষিত সম্পদ ছিল এক কোটি রুপিরও বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৯৩ শতাংশ বিজয়ী প্রার্থী ছিলেন কোটিপতি। সেখানে অবশ্য সব কোটিপতি প্রার্থী ব্যবসায়ী নন এবং সম্পদশালী হওয়া মানেই দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া নয়। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিপুল অংশ যখন সমাজের তুলনামূলকভাবে সম্পদশালী শ্রেণি থেকে আসে, তখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি সামনে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি আরও ভিন্নভাবে দেখা যায়। সেখানে ব্যবসায়ীরা সবাই সরাসরি নির্বাচনে দাঁড়ান না। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। ২০২৪ সালের মার্কিন ফেডারেল নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রক্ষেপণ ছিল। ফলে সেখানে প্রশ্নটি অনেক সময় হয়- কোন ব্যবসায়ী সংসদে বসছেন তা নয়, বরং নির্বাচনে কে কত অর্থ দিচ্ছেন এবং সেই অর্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে অর্থের প্রভাব যেখানে অনেক সময় প্রার্থী হওয়ার মাধ্যমে সরাসরি দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে তার একটি বড় অংশ দেখা যায় রাজনৈতিক অর্থায়ন ও নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে।
এখানে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে- ব্যবসায়ী বা ধনী মানুষ রাজনীতিতে থাকলেই কি জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে? উত্তর অবশ্যই না। একজন ধনী ব্যক্তি ভালো জনপ্রতিনিধি হতে পারেন, আবার একজন সাধারণ পেশার মানুষও খারাপ জনপ্রতিনিধি হতে পারেন। তাই সমস্যাকে ব্যক্তির সম্পদ দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। আসল বিষয় হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাটিই কি এমন, যেখানে অর্থবান হওয়ার কারণে কেউ অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষ অর্থের অভাবে পিছিয়ে যাচ্ছেন!
নির্বাচনের পর কী হচ্ছে?
সংসদের প্রধান কাজ আইন তৈরি করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সংসদীয় কার্যক্রমে কতটা সময় বাস্তব সমস্যার সমাধান, গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে গভীর আলোচনা এবং সরকারের জবাবদিহিতে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি আইন কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই আইন যদি পর্যাপ্ত আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই দ্রুত পাস হয়ে যায়, তাহলে শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলেই কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত হয় না।
কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনকে কেন্দ্র করে তৈরি কোনো ব্যবস্থা নয়। ভোটের আগে প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনী অর্থায়ন, প্রচারণার সুযোগ, ভোটের পরিবেশ, নির্বাচনের পর সংসদীয় কার্যক্রম, সরকারের জবাবদিটাটা এবং জনপ্রতিনিধির স্বচ্ছতা-সবকিছু মিলেই গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়।
এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হতে পারে নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা। একজন প্রার্থী কোথা থেকে কত টাকা পেলেন, কোথায় কত টাকা খরচ করলেন, কে তাকে অর্থ দিলেন- এসব তথ্য জনগণের কাছে সহজে পৌঁছানো দরকার। শুধু নির্বাচনের সময় হিসাব জমা দিলেই হবে না; সেই হিসাব বাস্তবে যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একইভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পদ, আয়, ব্যবসায়িক মালিকানা, ঋণ ও স্বার্থের সংঘাতের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
কারণ একজন সংসদ সদস্যের নিজের ব্যবসা যদি কোনো সরকারি নীতি বা আইনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন জনগণের স্বার্থে, নাকি নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায়? এখানে অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই; স্বচ্ছতার ব্যবস্থাই এমন সন্দেহ দূর করতে পারে। কোন এমপির কোন ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, তিনি কোন সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন এবং কোথায় স্বার্থের সংঘাত হতে পারে- এসব তথ্য প্রকাশ্য থাকলে জনগণও তার প্রতিনিধি সম্পর্কে ভালোভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়াও আরও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। কারণ ব্যালটে যাওয়ার আগেই যদি অর্থ, প্রভাব ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই হয়ে যায়, তাহলে ভোটারদের সামনে প্রকৃত বিকল্প কমে যায়। জনগণ তখন পাঁচজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেই পাঁচজনকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জনগণের ভূমিকা সত্যিই কতটা ছিল- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানে সমাধান হিসেবে ব্যবসায়ীদের রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়া কোনো যুক্তিসঙ্গত পথ নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে আইনজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নারী, তরুণ এবং অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ্যতা ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে রাজনীতিতে আসতে পারেন। অর্থ যেন রাজনৈতিক প্রবেশের প্রধান বাধা না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য।
কারণ একটি দেশের সংসদ যদি সেই দেশের সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়, তাহলে সেখানে শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী মানুষের উপস্থিতি বেশি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। একজন কৃষক প্রতিনিধি সংসদে থাকলে কৃষকের সমস্যা তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরতে পারেন। একজন আইনজীবী বিচারব্যবস্থার সমস্যা ও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে থাকা বাধাগুলো সংসদে তুলে ধরতে পারেন। একজন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকলে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা সরাসরি সংসদে পৌঁছাতে পারে। একজন শিক্ষক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা অন্যভাবে দেখতে পারেন। আবার একজন ব্যবসায়ী অর্থনীতি ও বিনিয়োগের সমস্যা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন। তাই প্রয়োজন কোনো একটি শ্রেণিকে বাদ দেওয়া নয়; প্রয়োজন সব শ্রেণির যোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের সংসদে এত ব্যবসায়ী কেন?
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত- বাংলাদেশের সংসদে কি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কথা বলার মতো যথেষ্ট সুযোগ আছে?
আর শুধু সংসদে কারা আছেন সেটিও শেষ কথা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, তারা কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন এবং পৌঁছানোর পর কার কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছেন?
যদি একজন সাধারণ নাগরিক ভোট দিতে পারেন কিন্তু অর্থের কারণে প্রার্থী হতে না পারেন, যদি একজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিপুল অর্থের ওপর নির্ভরশীল হন, যদি রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য অর্থ ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং নির্বাচিত হওয়ার পরও জনপ্রতিনিধিকে জনগণের চেয়ে দলীয় নেতৃত্বের কাছে বেশি জবাবদিহিতা করতে হয়, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামো কাগজে-কলমে ঠিক থাকলেও তার ভেতরের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগজনকভাবে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধু নির্বাচন আয়োজন করা নয়; নির্বাচনকে এমন একটি ব্যবস্থায় পরিণত করা, যেখানে অর্থ মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না। যেখানে একজন ধনী ব্যবসায়ী যেমন রাজনীতিতে আসতে পারেন, তেমনি একজন কৃষক বা শিক্ষকও অর্থের কারণে শুরুতেই পিছিয়ে না পড়েন। যেখানে সংসদে শুধু ক্ষমতাবানদের কণ্ঠ নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব অভিজ্ঞতাও সমানভাবে গুরুত্ব পায়।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন ভোটের অধিকার সবার হাতে সমানভাবে থাকার পাশাপাশি, সেই ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগও যেন (যতটা সম্ভব) সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- রাষ্ট্রের ক্ষমতা কি সত্যিই জনগণের হাতে, নাকি জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে অর্থ, দল ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে?
জনগণ কেমন রাষ্ট্র চায়?
জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রই চায়, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা জনগণের স্পন্দন বুঝবেন এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী মানুষের সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজবেন। যেখানে ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান হবে, দেশের সম্পদ ও জনগণের অর্থ নিরাপদ থাকবে, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়াও, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে ‘জনগণের স্বার্থ’। অর্থাৎ ক্ষমতায় যিনি থাকবেন, তার প্রথম দায়িত্ব হবে ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বরং জনগণের জীবনকে নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ করা।
জনগণের করণীয় কী?
তবে জনগণেরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে। শুধু নির্বাচনের দিন ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নাগরিকদের প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি, অতীত কর্মকাণ্ড, সততা, সম্পদ ও জনস্বার্থে তাদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। যারা ক্ষমতায় যাবেন, তাদের কাজের ওপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে এবং অন্যায়, দুর্নীতি, লুটপাট বা জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে হবে।
দল বা ব্যক্তির প্রতি অন্ধ সমর্থনের বদলে দেশের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কেবল শাসকদের নয়, নাগরিকদেরও। আর জনগণ যত বেশি সচেতন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিতার দাবি তুলবে, রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদেরও তত বেশি জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে।
- এফ. আর. ইমরান: সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক

