বাংলাদেশের ইতিহাসে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এমন একটি নাম, যাঁকে শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখলে পূর্ববাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যায়। আবার বাংলাদেশের জন্মের জন্য ঘটে যাওয়া সব বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক সংকটের দায় এককভাবে তাঁর ওপর চাপালেও ইতিহাস অতিরঞ্জিত হয়। কারণ বাংলাদেশ তখন অস্তিত্বশীল রাষ্ট্র ছিল না; বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডটি ছিল প্রথমে পূর্ববঙ্গ বা East Bengal, পরে পূর্ব পাকিস্তান। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র প্রায় ১৩ মাস পর, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা যান।
তারপরও বাংলাদেশের ইতিহাসে জিন্নাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের যে রাষ্ট্রদর্শন, শক্তিশালী কেন্দ্রের ধারণা, ভাষানীতি এবং বাঙালি পরিচয়ের প্রতি সন্দেহ – পরবর্তী দুই দশকে যেগুলো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংঘাতকে তীব্র করেছিল- তার কয়েকটির ভিত্তি তাঁর সময়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কে ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ?
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন একজন ব্যারিস্টার এবং ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকের জিন্নাহ এবং শেষ দিকের জিন্নাহর মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল। প্রথমদিকে তিনি হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে ছিলেন এবং ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মুসলিম প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক সংকটের মধ্যে তাঁর রাজনীতি ক্রমে পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তার দিকে যায়। পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব জীবনীও তাঁর এই রাজনৈতিক রূপান্তর স্বীকার করে।
১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে জিন্নাহ হিন্দু ও মুসলমানকে দুটি পৃথক রাজনৈতিক জাতি হিসেবে উপস্থাপন করেন। ওই অধিবেশনেই এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম ইউনিটের কথা বলা হয়েছিল। পরে এটিই পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ – দ্বিজাতি তত্ত্ব জিন্নাহ একাই আবিষ্কার করেছিলেন, এমনভাবে ইতিহাসকে দেখা ঠিক নয়। এর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক শিকড় আরও পুরোনো। তবে ১৯৪০-এর দশকে এটিকে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের প্রধান রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে জিন্নাহর নেতৃত্ব ছিল নির্ণায়ক।
দেশভাগ: জিন্নাহর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার?
১৯৪৬ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর মুসলিম লীগ ‘Direct Action’-এর কর্মসূচি নেয়। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ ‘Direct Action Day’ পালনের আহ্বান আসে লীগ থেকে। কলকাতায় ওই কর্মসূচি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নেয় এবং পরবর্তী সময়ে নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং জিন্নাহর রাজনৈতিক কৌশল যে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল- এ কথা বলার ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
কিন্তু এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা ও বিপুল প্রাণহানির একমাত্র দায় জিন্নাহর ওপর চাপানো ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, শিখ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত- সব মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
অর্থাৎ জিন্নাহ ছিলেন দেশভাগের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি; কিন্তু দেশভাগের সব সহিংসতার একমাত্র স্থপতি নন।
সবচেয়ে বড় সংঘাত: বাংলা না উর্দু?
বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আসে ১৯৪৮ সালের মার্চে তাঁর ঢাকা সফরে।
সেই সময় পূর্ববঙ্গের মানুষের বড় অংশ চাইছিল বাংলা যেন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়। এটি কোনো ছোট আঞ্চলিক ভাষার দাবি ছিল না। ১৯৫১ সালের পাকিস্তানের প্রথম আদমশুমারিতে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত; পূর্ববঙ্গের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।
অর্থাৎ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষাই ছিল বাংলা।
তারপরও ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, “Urdu, and Urdu alone, shall be the State Language of Pakistan” (উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা) এবং অন্য কোনো ভাষা নয়। তাঁর ওই ভাষণের সংরক্ষিত পাঠেও এ বক্তব্য পাওয়া যায়।
তিনি অবশ্য বলেছিলেন, পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক সরকারি ভাষা কী হবে, তা পূর্ববঙ্গের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ঠিক করতে পারবেন। কিন্তু একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষাকে সমমর্যাদা দিতে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
এখানেই তাঁর নীতির বড় রাজনৈতিক ভুলটি ছিল।
কারণ সমস্যাটি শুধু ভাষার ছিল না
একজন বাঙালির কাছে বাংলা ছিল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়- তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ইতিহাস ও পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
কিন্তু জিন্নাহ পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়কে মূলত মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। ২১ মার্চের ভাষণে তিনি বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি বা পাঠান পরিচয়ের বদলে মুসলিম ও পাকিস্তানি পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতে বলেন। প্রাদেশিক পরিচয়কে তিনি জাতীয় ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক বলে দেখেছিলেন।
এই জায়গায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদর্শন এবং বাঙালি জাতীয় চেতনার প্রথম বড় সংঘর্ষটি দৃশ্যমান হয়।
জিন্নাহর যুক্তি ছিল- এক রাষ্ট্রের জন্য একটি অভিন্ন রাষ্ট্রভাষা প্রয়োজন।
বাঙালিদের পাল্টা প্রশ্ন ছিল- দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা কেন রাষ্ট্রভাষা হবে না?
দ্বিতীয় প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তর পাকিস্তানি কেন্দ্র কখনোই দিতে পারেনি।
ভাষার দাবিকে কেন নিরাপত্তার সমস্যা বানালেন?
জিন্নাহর ঢাকা বক্তৃতার আরেকটি অংশ আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি ভাষা আন্দোলনের পেছনে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদী’, বিদেশি প্রভাব এবং পাকিস্তানকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র থাকার অভিযোগ করেছিলেন। ভাষার দাবির সঙ্গে ভারতীয় ষড়যন্ত্র, ‘ফিফথ কলামিস্ট’ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের আশঙ্কাকে তিনি যুক্ত করেন।
এখানেই ভবিষ্যৎ পাকিস্তানি রাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক প্রবণতার পূর্বাভাস দেখা যায়।
পরবর্তী সময়ে—
বাঙালির ভাষার দাবি,
প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি,
শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা,
এমনকি নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিকেও – পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্র প্রায়ই রাষ্ট্রবিরোধিতা বা বিচ্ছিন্নতাবাদের দৃষ্টিতে দেখেছিল।
জিন্নাহ সরাসরি ১৯৭১ সালের এসব ঘটনার জন্য দায়ী নন। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক বা প্রাদেশিক দাবি মানেই পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতি সম্ভাব্য হুমকি – এমন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রাথমিক রূপ তাঁর ১৯৪৮ সালের ভাষণেই পাওয়া যায়।
এ কারণেই ভাষা প্রশ্নে তাঁর সিদ্ধান্ত শুধু একটি ভুল ভাষানীতি ছিল না; এটি ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের মৌলিক সংকটের প্রকাশ।
১৯৫২ ও ১৯৭১-এর সঙ্গে জিন্নাহর যোগ কোথায়?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন জিন্নাহর মৃত্যুর প্রায় সাড়ে তিন বছর পরে সংঘটিত হয়। তাই একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের দায় তাঁর ওপর দেওয়া যাবে না।
কিন্তু ১৯৪৮ সালে তিনি যে রাষ্ট্রভাষা নীতি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিলেন, পাকিস্তানের পরবর্তী শাসকরাও সেটিই ধরে রাখেন। খাজা নাজিমুদ্দীন ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এর প্রতিবাদেই আন্দোলন নতুন করে তীব্র হয়।
সুতরাং একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়:
১৯৪৮ — রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর ঘোষণা
→ ১৯৫২ — ভাষা আন্দোলন
→ বাংলা পরিচয়ের রাজনৈতিক বিকাশ
→ স্বায়ত্তশাসনের দাবি
→ ছয় দফা
→ ১৯৭০-এর নির্বাচনী সংকট
→ ১৯৭১-এর স্বাধীনতা।
তবে একে সরল কারণ-ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ১৯৭১-এর পেছনে ভাষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামরিক আধিপত্য, ছয় দফা, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের সামরিক অভিযান- সবই ছিল নির্ণায়ক।
জিন্নাহ কি পূর্ববাংলাকে অবহেলা করতেন?
এ প্রশ্নের উত্তর একেবারে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।
১৯৪৮ সালের ঢাকার একই বক্তৃতায় জিন্নাহ পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে পূর্ববঙ্গের মানুষ সরকারি কার্যক্রমে তাদের ‘ন্যায্য ও বৈধ অংশ’ পাওয়ার বিষয়টি তুলেছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার তা নিশ্চিত করতে চায় বলে আশ্বাস দেন।
এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এতে বোঝা যায়, পূর্ববঙ্গে প্রতিনিধিত্ব ও বঞ্চনা নিয়ে উদ্বেগ পাকিস্তানের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, জিন্নাহ একদিকে পূর্ববঙ্গের ন্যায্য অংশের আশ্বাস দিচ্ছেন, অন্যদিকে একই বক্তৃতায় বাঙালি ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যকে আঞ্চলিকতা (provincialism)-এর সমস্যা হিসেবে দেখছেন।
এই দ্বৈততা পরবর্তী পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ কতটা সত্য?
জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হওয়ার পাশাপাশি গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগেরও শীর্ষ নেতা ছিলেন। গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে নবগঠিত রাষ্ট্রে দল, সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের বিভিন্ন ভূমিকা তাঁর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এক জায়গায় এসে মিলেছিল।
তাঁর সমর্থকদের যুক্তি হলো- ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান ছিল ভয়াবহ সংকটে থাকা একটি সদ্যোজাত রাষ্ট্র। উদ্বাস্তু সমস্যা, সম্পদ ভাগাভাগি, কাশ্মীর যুদ্ধ, প্রশাসনিক সংকট ও অর্থসংকটের মধ্যে শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল।
সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। তাঁদের মতে, জিন্নাহ শক্তিশালী কেন্দ্র এবং গভর্নর জেনারেলের প্রভাবশালী ভূমিকার যে নজির তৈরি করেন, তা পাকিস্তানে পরবর্তীকালে সংসদীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার সংস্কৃতিতে সহায়ক হয়েছিল।
তবে পাকিস্তানের পরবর্তী সামরিক শাসনের জন্য সরাসরি জিন্নাহকে দায়ী করা অতিসরলীকরণ। তিনি মারা যান ১৯৪৮ সালে; প্রথম সামরিক শাসন আসে এক দশক পরে। মধ্যবর্তী সময়ে আরও বহু রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
পূর্ব-পশ্চিম অর্থনৈতিক বৈষম্য: কতটা জিন্নাহর দায়?
পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান সত্যিই ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। পাটের রপ্তানি আয় কেন্দ্রের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস ছিল, অথচ উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পায়ন ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে পশ্চিম পাকিস্তান বেশি সুবিধা পেত। গবেষণায় দেখা যায়, স্বাধীনতার সময় থেকেই কিছু ব্যবধান থাকলেও ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়; এক পর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্বের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি হয়ে যায়।
কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শোষণকে ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহর তৈরি ব্যবস্থা বলা কঠিন।
কারণ তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র প্রায় এক বছর।
আর বৈষম্যের সবচেয়ে গভীর পর্যায় তৈরি হয় তাঁর মৃত্যুর পর – লিয়াকত আলী খান, আমলাতান্ত্রিক শাসন, ‘ওয়ান ইউনিট’, আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের সময়।
তাই বেশি নির্ভুল ভাষায় বলা যায়:জিন্নাহর আমলে একটি পশ্চিমকেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল; কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শোষণব্যবস্থা পরবর্তী শাসকদের সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাপক রূপ নেয়।
প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে বাঙালির অবস্থান
পাকিস্তানের জন্মের পর কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম ছিল। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পশ্চিম পাকিস্তানি- বিশেষত পাঞ্জাবি এবং উর্দুভাষী অভিবাসী এলিটের প্রাধান্য তৈরি হয়েছিল।
জিন্নাহ নিজেও ঢাকার বক্তৃতায় পূর্ববঙ্গের তরুণদের সামরিক বাহিনীতে প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন।
এটি আবারও দেখায় যে সমস্যাটির অস্তিত্ব তিনি জানতেন।
কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতার মূল প্রতিষ্ঠান- কেন্দ্রীয় প্রশাসন, সামরিক বাহিনী এবং রাজধানী- পশ্চিমাংশে কেন্দ্রীভূত থাকার ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির জনসংখ্যাগত শক্তি বাস্তব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিফলিত হয়নি।
এই বৈপরীত্যই পরে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হয়।
কলকাতা হারানোর দায় কি জিন্নাহর?
এখানেও প্রচলিত বক্তব্য সংশোধন করা প্রয়োজন।
‘জিন্নাহ বাংলা ভাগ করে কলকাতা ভারতের হাতে দিয়ে দিয়েছিলেন’ – এভাবে বলা ইতিহাসসম্মত নয়।
বরং ১৯৪৭ সালের মে মাসে জিন্নাহ প্রকাশ্যে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসে সংরক্ষিত তাঁর ৪ মে ১৯৪৭-এর বক্তব্যে তিনি কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার বাংলা ভাগের দাবির বিরোধিতা করেন।
বাংলা বিভক্ত হওয়ার রাজনীতি ছিল অনেক জটিল।
হিন্দু মহাসভা পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করার জোরালো দাবি তুলেছিল। বাংলার মুসলিম নেতৃত্বেরও অবস্থান এক ছিল না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু ও আবুল হাশিমদের একটি অংশ স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলা রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেছিলেন। জিন্নাহ এ ধারণার সরাসরি বিরোধিতা করেননি। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের উচ্চপর্যায়ের শেষ পর্যন্ত মাউন্টব্যাটেনের বিভাজন পরিকল্পনা মেনে নেওয়া এবং বঙ্গীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ফলে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।
২০ জুন ১৯৪৭ বঙ্গীয় আইনসভার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন; বিপরীতে পশ্চিমাঞ্চলের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা বিভাজনের পক্ষে ভোট দেন। শেষ পর্যন্ত র্যাডক্লিফ কমিশন সীমানা নির্ধারণ করে এবং কলকাতা ভারতের অংশ হয়।
অতএব, কলকাতা হারানোর সম্পূর্ণ দায় জিন্নাহর ওপর দেওয়া যাবে না। তবে. এটাও সত্য যে তাঁর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান আন্দোলন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণাই এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যেখানে বাংলা শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিভক্ত হয়।
এটাই ইতিহাসের সূক্ষ্ম পার্থক্য।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য: ১১ আগস্ট বনাম ২১ মার্চ
জিন্নাহর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বোঝার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা সম্ভবত তাঁর দুটি বক্তৃতার তুলনা।
১১ আগস্ট ১৯৪৭, করাচি
পাকিস্তানের গণপরিষদে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাস রাষ্ট্রের কাজে বাধা হওয়া উচিত নয় এবং সবাই সমান নাগরিক হবে। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য ছিল- “You may belong to any religion or caste or creed…” এ বক্তব্যের ভিত্তিতে অনেকে জিন্নাহকে ধর্মীয়ভাবে সহনশীল, নাগরিকভিত্তিক পাকিস্তানের প্রবক্তা হিসেবে দেখেন।
২১ মার্চ ১৯৪৮, ঢাকা
মাত্র সাত মাস পরে পূর্ববঙ্গে তিনি জাতীয় সংহতির যুক্তিতে মুসলিম পরিচয়ের ওপর জোর দেন, প্রাদেশিক পরিচয় পরিত্যাগের আহ্বান জানান এবং উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান ঘোষণা করেন।
এই দুটি বক্তব্যের মধ্যকার টানাপোড়েনই জিন্নাহকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অন্যতম কারণ।
তিনি কি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন?
নাকি মুসলিম জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাষ্ট্র?
এর সহজ উত্তর নেই। সম্ভবত তাঁর রাজনীতিতে একই সঙ্গে নাগরিক সমতার ধারণা এবং মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণা- দুটিই ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই দুই ধারণাকে একত্রে কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেই সাংবিধানিক কাঠামো তিনি দিয়ে যেতে পারেননি।
তাহলে জিন্নাহ বাংলাদেশের কী ক্ষতি করেছিলেন?
ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হবে- জিন্নাহ স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি; কারণ বাংলাদেশ নামক কোন রাষ্ট্র তখনও সৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর তিনটি সিদ্ধান্ত বা অবস্থানের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ছিল।
প্রথমত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ওপর তাঁর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিগত-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের শক্তিকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়।
দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার তাঁর অবস্থান পূর্ববাংলার মানুষের মধ্যে পাকিস্তানি রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
তৃতীয়ত, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র এবং প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর সন্দেহ এমন একটি রাষ্ট্রদর্শনকে বৈধতা দেয়, যা পরে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
তবে তাঁর ওপর ১৯৫২-এর হত্যাকাণ্ড, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬০-এর দশকের অর্থনৈতিক বৈষম্যের পুরো বিস্তার, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার অথবা ১৯৭১ সালের গণহত্যার সরাসরি দায় দেওয়া ইতিহাসসম্মত নয়। এসব ঘটেছিল তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে এবং ভিন্ন শাসকদের সিদ্ধান্তে। এসব সংকটের মূলে তার প্রভাব ছিল, তবে, কতটা ছিল- তা প্রমাণসহ বলা এতটাও সহজ নয়।
জিন্নাহর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল কোথায়?
বিশেষ বিশ্লেষণে বলা যায়, পূর্ববাংলার ক্ষেত্রে জিন্নাহর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্থ বুঝতে না পারা নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া।
তিনি বুঝেছিলেন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল অংশ।
তিনি জানতেন বাঙালিরা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে অংশীদারত্ব চাইছে।
তিনি স্বীকার করেছিলেন পূর্ববঙ্গের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা দরকার।
তারপরও তিনি ধারণা করেছিলেন, ইসলামি রাজনৈতিক পরিচয় এবং একটি রাষ্ট্রভাষা পাকিস্তানের ভৌগোলিক ও জাতিগত বিভাজনকে অতিক্রম করতে পারবে।
সেখানেই তাঁর হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়।
কারণ পূর্ববাংলার মানুষ মুসলমান হওয়ার পাশাপাশি বাঙালিও ছিল। তাদের কাছে এই দুটি পরিচয় পরস্পরবিরোধী ছিল না। পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন একটি পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়ে অন্যটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করল, তখন সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালির দূরত্ব বাড়তে শুরু করল।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১: যে প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তান দিতে পারেনি
পাকিস্তানের জন্মের মৌলিক যুক্তি ছিল- ভারতীয় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর অধীনে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার হারাতে পারে, তাই তাদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রয়োজন।
কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই একটি বড় বৈপরীত্য দেখা দিল।
যে রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার যুক্তিতে সৃষ্টি হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ছিল বাঙালি।
১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে বাংলা ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি মানুষের ভাষা।
তাহলে প্রশ্ন উঠল,
সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষা কেন সমমর্যাদার রাষ্ট্রভাষা নয়?
সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন কেন্দ্রের ওপর প্রতিফলিত হবে না?
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী কেন সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রে সংখ্যালঘু থাকবে?
এ প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর পাকিস্তানি রাষ্ট্র দিতে পারেনি।
জিন্নাহর সময়েই প্রথম প্রশ্নটির সংঘর্ষ প্রকাশ্যে আসে।
পরবর্তী ২৩ বছরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক বৈষম্য।
শেষ বিচারে জিন্নাহ
বাংলাদেশের ইতিহাসে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কেবল ‘খলনায়ক’ অথবা কেবল ‘মহান রাষ্ট্রনায়ক’ – দুই ধরনের একমাত্রিক পরিচয়ের যেকোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করলে ইতিহাসের জটিলতা হারিয়ে যায়।
তিনি একসময় হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার প্রবক্তা ছিলেন; পরে মুসলিম স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতিসত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হন। তিনি ১১ আগস্ট ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক সমতার কথা বলেছেন; আবার কয়েক মাস পর ঢাকায় এসে ভাষাভিত্তিক বাঙালি দাবিকে পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে দেখেছেন। তিনি পূর্ববঙ্গের ‘ন্যায্য অংশ’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; কিন্তু একই সঙ্গে সেই পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষার সমমর্যাদা দিতে অস্বীকার করেছেন।
তাই বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে জিন্নাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত পাকিস্তান সৃষ্টি নয়- বরং পাকিস্তান সৃষ্টির পর ‘এক ধর্ম মানেই এক জাতি’ ধারণার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাওয়া।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় দাঁড়িয়ে উর্দুর প্রশ্নে তাঁর কঠোর অবস্থান সেই সীমাবদ্ধতাকে প্রথম বড় আকারে সামনে নিয়ে আসে।
আর ইতিহাসের পরিহাস হলো- যে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সমর্থন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই পূর্ববঙ্গই মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয়।
১৯৭১ তাই শুধু পাকিস্তানের ভৌগোলিক বিভক্তি ছিল না; অনেক ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণে এটি ১৯৪৭ সালের সেই ধারণারও বড় পরীক্ষা ছিল যে শুধু ধর্মীয় অভিন্নতাই দুই ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতিরাষ্ট্রে ধরে রাখতে পারবে।

