বিশেষ বিশ্লেষন
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করেছে, যার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের যে বিতর্কিত দাবি বারবার তুলেছিলেন, তার জেরে সৃষ্ট প্রায় দুই বছরের উত্তেজনার সাময়িক অবসান ঘটল এই সমঝোতায়। তবে আইনি কাঠামোর দিক থেকে এটি নতুন কোনো চুক্তি নয়, বরং ১৯৫১ সালের একটি পুরোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির সংশোধনী।
আইনি ভিত্তি কোথায়
নতুন এই সমঝোতা মূলত ১৯৫১ সালে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি (ন্যাটো সনদ) অনুযায়ী স্বাক্ষরিত মার্কিন-ডেনিশ প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি সংশোধিত ও সম্প্রসারিত রূপ। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, চুক্তির শিরোনামেই বলা হয়েছে এটি ১৯৫১ সালের ২৭ এপ্রিলের চুক্তিকে সংশোধন ও সম্পূরক করছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে নতুন কোনো সার্বভৌম অধিকার পায়নি, বরং বিদ্যমান চুক্তিগত কাঠামোর আওতায় তাদের ক্ষমতা ও পরিসর বাড়ানো হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেন সই অনুষ্ঠানে বলেন, ১৯৫১ সাল থেকে বিশ্ব অনেক বদলেছে, আর সেই বাস্তবতা বিবেচনা করেই পুরোনো চুক্তি হালনাগাদ করা হয়েছে। এর আগে ২০০৪ সালেও একবার চুক্তিটি সংশোধিত হয়েছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে হলে আগেভাগে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে জানানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
দুটি নতুন ঘাঁটি, তবে দখল নয়
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে নারসারসুয়াক ও পূর্বাঞ্চলে মেস্টারসভিগে দুটি নতুন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মিত হবে। এর বাইরে দ্বীপের উত্তরে বহু আগে থেকেই সক্রিয় পিটুফিক ঘাঁটিও বহাল থাকছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ বলে বর্ণনা করলেও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকার স্পষ্ট করেছে, এতে অঞ্চলটির সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর হয়নি।
চুক্তিতে ডেনমার্ক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার; দুটোরই স্বীকৃতি রাখা হয়েছে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারিত হলেও গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডগত মর্যাদা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসছে না।
স্বাধীনতা পেলেও বলবৎ থাকবে চুক্তি
চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রায় ৫৭ হাজার অধিবাসীর এই দ্বীপ ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও এই সমঝোতা কার্যকর থাকবে। এই শর্তের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডকে হয় ন্যাটোতে সদস্য হিসেবে থেকে যেতে হবে, নয়তো ভবিষ্যতে ন্যাটোতে যোগ দিতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মর্যাদা বদলালেও নিরাপত্তা বাধ্যবাধকতা অপরিবর্তিত থাকবে, যা আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনের দিক থেকে একটি অস্বাভাবিক ও দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত খাতগুলোতে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর মূল লক্ষ্য চীন ও রাশিয়াকে গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি স্থাপন, সেনা পাঠানো বা বিরল খনিজসহ স্পর্শকাতর খাতে বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র পথের ওপর অবস্থিত হওয়ায় গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি দ্বীপটিতে এখনো অব্যবহৃত বিরল খনিজের বিশাল মজুত রয়েছে, আর মেরু বরফ গলার কারণে নতুন বাণিজ্যিক নৌপথ খুলে যাওয়ায় এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে।
চীন-রাশিয়ার প্রবেশ কেন সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে
গ্রিনল্যান্ডে চীন বা রাশিয়া ঘাঁটি বা সেনা উপস্থিতি হলে তা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অনুপ্রবেশ হিসেবে গণ্য হবে। এতে গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কাগজে-কলমে বহাল থাকলেও, প্রতিটি বিদেশি বিনিয়োগ বা সম্পর্ক তখন পরাশক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখা হবে, ফলে তাদের প্রকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সংকুচিত হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এটি নিজেদের উত্তর সীমান্তের কাছে নতুন কৌশলগত হুমকি তৈরি করবে, যা ইউরোপকে প্রতিরক্ষায় আরও বেশি মার্কিন নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেবে এবং তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দুর্বল করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি। গ্রিনল্যান্ড রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ততম ক্ষেপণাস্ত্র পথে অবস্থিত ও প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তাকেই ঝুঁকিতে ফেলবে।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন চুক্তির পর সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর দেশ এখন আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং এই সমঝোতা গ্রিনল্যান্ডে শান্তি ফিরিয়ে আনবে বলে তিনি আশা করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান আন্তোনিও কোস্তা এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও এই চুক্তিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
তবে সবাই আশ্বস্ত নন। কোপেনহেগেনের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী গ্যাভিন শার্প মনে করেন, পরিস্থিতি মূলত অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে, আর ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন ভোটারদের সমর্থন আদায়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেন নিজেও স্বীকার করেছেন, চুক্তি সইয়ের পরও দেশে ফিরে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের কাজ এখনো বাকি।

