বিশেষ বিশ্লেষণ
একই সময়ে বাংলাদেশে দুটো কোম্পানির গল্প পাশাপাশি রাখলে বিষয়টা অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে নওগাঁর একটা অটোমেটিক রাইস মিল কোম্পানি, যার মালিক নিজেই আদালতে গিয়ে দেউলিয়া ঘোষণা চেয়েছেন ২৫২ কোটি ২৪ লাখ টাকার ঋণ শোধ করতে না পেরে, আর আদালত তাঁকে দেউলিয়া ঘোষণাও করে দিয়েছে। অন্যদিকে আছে বেক্সিমকো গ্রুপ, যাদের অন্তত ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া ঋণ ও দায় ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে ৩১ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিয়েছে। অথচ বেক্সিমকো গ্রুপকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়নি; হাইকোর্ট বরং নির্দেশ দিয়েছে গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ দেখভালের জন্য একজন রিসিভার নিয়োগ করতে। একদিকে ২৫২ কোটি টাকার ঋণে একটা কোম্পানি আইনিভাবে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণেও একটা গ্রুপ দেউলিয়া নয়, বরং রিসিভারশিপে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্যটাই আসলে আজকের প্রশ্নটাকে জরুরি করে তোলে; কোম্পানির জন্য দেউলিয়া ঘোষণা আসলে কী? এটা কি ব্যবসায়িক ব্যর্থতার সরকারি সিলমোহর, নাকি ঋণের বোঝা থেকে বেরিয়ে আসার একটা কাঠামোবদ্ধ আইনি পথ, যেটা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না?
উচ্চ মূল্যস্ফীতি যেভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ আইনি তথ্য না জানলে পুরো বিষয়টাই ঘোলাটে থেকে যায়। বাংলাদেশে দেউলিয়া বিষয়ক আইন, ১৯৯৭ প্রণয়নের আগে কোনো নিবন্ধিত কোম্পানিকে সরাসরি দেউলিয়া ঘোষণা করার কোনো আইনি সুযোগই ছিল না। এই আইনের ২(৩৬) ধারায় “ব্যক্তি” শব্দের সংজ্ঞায় কোম্পানি, সংবিধিবদ্ধ বা অন্যবিধ সংস্থা, সমিতি ও অংশীদারি কারবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরই কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করার আইনি পথ খোলে। আইনের ৯২ ধারায় আরও বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই আইনের অধীন অপরাধ করলে তার মালিক, পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা সচিব ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন, যদি না তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তাঁর অজ্ঞাতসারে ঘটেছে বা তা রোধ করতে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে কোম্পানি বন্ধ করার জন্য দেউলিয়া বিষয়ক আইনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহৃত হয় কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অবলুপ্তি বা winding up সংক্রান্ত বিধান। এই আইন অনুযায়ী একটি কোম্পানি তিনভাবে অবলুপ্ত হতে পারে; আদালতের মাধ্যমে, স্বেচ্ছায়, অথবা আদালতের তত্ত্বাবধানে। এই প্রক্রিয়ায় একজন লিকুইডেটর নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে দায় মেটান, আর পরিশোধের ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার মানতে হয়; প্রথমে কর্মচারীদের বেতন ও আইনি পাওনা, তারপর ঋণদাতাদের পাওনা। যদি প্রতারণা, জালিয়াতি বা অবৈধ লেনদেন প্রমাণিত হয়, তাহলে পরিচালকরা ব্যক্তিগতভাবেও দায়ী হতে পারেন। অর্থাৎ কোম্পানির জন্য বাংলাদেশে কার্যত দুটো সমান্তরাল আইনি পথ আছে; একটা দেউলিয়া বিষয়ক আইনের, আরেকটা কোম্পানি আইনের অবলুপ্তি বিধানের; আর বাস্তবে দ্বিতীয়টাই বেশি ব্যবহৃত হয়।
আইন আছে, তবু বড় কোম্পানি কেন দেউলিয়া হয় না
প্রশ্ন হলো, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক দেউলিয়া ঘোষণার ঘটনা এত কম কেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বোচ্চ, আর ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাপক পুনঃতফসিলের কারণে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, এই খেলাপি ঋণের সংকট মূলত কেন্দ্রীভূত বড় ঋণগ্রহীতাদের ঘিরে; ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই এখন খেলাপি, যেখানে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ছোট ঋণের খেলাপির হার মাত্র ১৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, বড় কোম্পানিগুলোই আসলে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হচ্ছে, তবু তারাই সবচেয়ে কম দেউলিয়া ঘোষিত হচ্ছে। এর একটা বড় কারণ হলো, ব্যাংকগুলো কোম্পানির বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের জন্য দেউলিয়া আইনের বদলে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর অধীনে সরাসরি সম্পদ ক্রোক বা নিলামের মামলা করাটাই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু এই পথও কার্যত অচল হয়ে আছে; সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতে ২ লাখ ২২ হাজারের বেশি মামলা ঝুলে আছে, যেখানে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, আর মাত্র তিন মাসেই এই মামলার সংখ্যা প্রায় ২৭০০ বেড়েছে। এর আগে এক হিসাবে দেখা গিয়েছিল, দেশের ৬৮টি অর্থঋণ আদালতে গড়ে একজন বিচারককে এক হাজারের বেশি মামলা সামলাতে হয় আর মামলা নিষ্পত্তির হার বছরের পর বছর ধরে দশ শতাংশের নিচে থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ কোম্পানির বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের প্রধান আইনি পথটাই যেখানে জট পাকিয়ে আছে, সেখানে আরও ধীরগতির ও কম পরিচিত দেউলিয়া আইনে যাওয়ার আগ্রহ ব্যাংকগুলোর কম থাকাটাই স্বাভাবিক।
বেক্সিমকোর মতো বড় গ্রুপ দেউলিয়া না হয়ে রিসিভারশিপে যায় কেন
বেক্সিমকো গ্রুপের ঘটনাটা আসলে বড় কোম্পানিদের জন্য বাংলাদেশে কীভাবে ভিন্ন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, তার একটা জীবন্ত উদাহরণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট এক রিটের শুনানিতে বেক্সিমকো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ দেখভালের জন্য রিসিভার নিয়োগের নির্দেশ দেয়, আর একই সঙ্গে গ্রুপটির প্রকৃত বকেয়া ঋণের পরিমাণ জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটা চলেছে রিট আবেদন ও হাইকোর্টের সাধারণ এখতিয়ারের মাধ্যমে, দেউলিয়া বিষয়ক আইনের মধ্য দিয়ে নয়। রিসিভারশিপ মানে হলো কোম্পানির মালিকানা কাঠামো অক্ষত রেখে শুধু সম্পদ পরিচালনার দায়িত্ব সাময়িকভাবে একজন তৃতীয় পক্ষের হাতে দেওয়া, যেখানে দেউলিয়া ঘোষণার মতো আনুষ্ঠানিক দায়মুক্তি বা কোম্পানির আইনি অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে না। এর পাশাপাশি বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতিগত সুবিধাও কম নেই। এক হাজার কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণ খেলাপিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে দুই বছরের কিস্তি বিরতিসহ পনেরো বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে, আর আরেকটি নীতিমালার আওতায় মাত্র দুই শতাংশ, পরে এক শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দশ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। এই সুবিধাগুলোর কারণেই মূলত সেপ্টেম্বরের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বরে নেমে আসে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে। কিন্তু কাগজে-কলমে খেলাপির সংজ্ঞা পিছিয়ে দেওয়া আর প্রকৃত ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হওয়া এক জিনিস নয়। বড় কোম্পানির সামনে যেখানে বারবার পুনঃতফসিল বা রিসিভারশিপের মতো নমনীয় পথ খোলা থাকে, সেখানে ছোট কোম্পানির সামনে সেই সুযোগ না থাকায় শেষ উপায় হিসেবে আনুষ্ঠানিক দেউলিয়া ঘোষণাই তার একমাত্র বাস্তব আইনি পথ হয়ে দাঁড়ায়।
আমেরিকায় বছরে হাজারের বেশি কোম্পানি দেউলিয়া হয়, তবু ব্যবসা বন্ধ হয় না
এবার একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। উন্নত অর্থনীতিতে কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণাকে ব্যবসায়িক মৃত্যু বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে দেখা হয় ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটা স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে বড় ও মাঝারি কোম্পানির দেউলিয়া আবেদন দাঁড়ায় ৬৯৪টিতে, যা গত চৌদ্দ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ২০২৩ সালের ৬৩৫টি ও করোনাকালীন ২০২০ সালের ৬৩৮টির চেয়েও বেশি। এই ধারা ২০২৫ সালেও অব্যাহত থাকে; বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩৭১টি বড় মার্কিন কোম্পানি দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি এবং ২০১০ সালের পর সবচেয়ে ব্যস্ত প্রথমার্ধ। এই তালিকায় রাইট এইড, ক্লেয়ার্সের মতো পরিচিত ব্র্যান্ড যেমন আছে, তেমনি আছে জোয়ান নামের একটি হস্তশিল্প খুচরা প্রতিষ্ঠান, যাদের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০ কোটি ডলার, আর সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক ওলফস্পিড, যাদের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। এই কোম্পানিগুলো চ্যাপ্টার ইলেভেনের অধীনে দেউলিয়া আবেদন করেও ব্যবসা চালু রেখেছে, ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ নিয়েছে, এমনকি নতুন করে অর্থায়নও পেয়েছে। এখানেই মূল দর্শনগত পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়, পশ্চিমা অর্থনীতিতে কোম্পানির দেউলিয়া আইনকে দেখা হয় একটা কাঠামোবদ্ধ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হিসেবে, যেখানে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং ঋণের চাপ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে দাঁড়ানোটাই মূল লক্ষ্য।
এই দুর্বলতার আসল অর্থনৈতিক মূল্য কে দিচ্ছে
কোম্পানির ঋণ আদায় বা দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়া দুর্বল থাকার একটা বাস্তব অর্থনৈতিক খেসারতও আছে, যা বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। বাংলাদেশে দেউলিয়াত্বের ক্ষেত্রে পাওনাদারদের পুনরুদ্ধারের হার মাত্র ২৯ দশমিক ১ সেন্ট প্রতি ডলারে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৩৮ দশমিক ১ সেন্ট আর নরওয়েতে তা ৯২ দশমিক ৯ সেন্ট। একটি ফোরক্লোজার বা সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শেষ হতে বাংলাদেশে সময় লাগে প্রায় চার বছর, দক্ষিণ এশিয়ার গড় ২ দশমিক ২ বছরের বিপরীতে, আর আয়ারল্যান্ডে এটি লাগে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ বছর। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিজনেস রেডি সূচকেও একই দুর্বলতা ধরা পড়ে; ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যবসায়িক দেউলিয়াত্ব বিষয়ক সূচকে একশোর মধ্যে মাত্র ৪১ পেয়েছে, যা দশটি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল স্কোরগুলোর একটি। এই সংখ্যাগুলোর অর্থ সহজ, একটা দুর্বল কর্পোরেট দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থা মানে হলো, ব্যাংক তার পাওনার সিংহভাগ কখনোই ফেরত পায় না, বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে ঋণ দিতে ভয় পান, আর ব্যাংকগুলো ঝুঁকি সামলাতে সুদহার বাড়িয়ে দেয়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করা সৎ কোম্পানিগুলোর কাঁধেই। অর্থাৎ কোম্পানির দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়ার এই দুর্বলতা শুধু কিছু নির্দিষ্ট মামলার সমস্যা নয়, এটা গোটা অর্থনীতির ঋণ ব্যবস্থাকেই ব্যয়বহুল করে তুলছে।
তাহলে আসল উত্তরটা কী
এখন মূল প্রশ্নে ফেরা যাক, একটা কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণা কি ব্যর্থতা, নাকি আইনি মুক্তি? আমার পর্যবেক্ষণ হলো, কোম্পানির ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তরটা ব্যক্তির চেয়েও বেশি স্পষ্ট, কারণ সীমিত দায়বদ্ধতার (limited liability) ধারণাটাই আধুনিক কোম্পানি কাঠামোর মূল ভিত্তি। একজন উদ্যোক্তা যখন কোম্পানি গঠন করেন, তখন আইনের চোখে কোম্পানি আর তার মালিক আলাদা দুটো সত্তা হয়ে যায়, কোম্পানি ব্যর্থ হলে সেটা মালিকের ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটা ব্যবসায়িক ঝুঁকির একটা স্বাভাবিক পরিণতি, যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেই স্বীকৃত। ঠিক এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে বছরে হাজারের বেশি কোম্পানি দেউলিয়া আবেদন করেও ব্যবসা চালিয়ে যায়, কেউ তাতে বাড়তি সামাজিক কলঙ্ক দেখে না। কিন্তু এই সীমিত দায়বদ্ধতার সুবিধা যেন প্রতারণার আশ্রয়ে পরিণত না হয়, সে জন্যই আইনে পরিচালকের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিধান রাখা হয়েছে; কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী জালিয়াতি বা অবৈধ লেনদেন প্রমাণিত হলে পরিচালকরা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হন, আর দেউলিয়া বিষয়ক আইনের ৯২ ধারা অনুযায়ীও কোম্পানির অপরাধের জন্য তার কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহির মুখে পড়েন। অর্থাৎ কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণা নিজে থেকে ভালো বা মন্দ কিছু নয়; এটা তখনই ন্যায়সংগত প্রতিকার, যখন প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে যাচাই-বাছাই করে পরিচালিত হয় আর জালিয়াতি হলে দায়ীদের ব্যক্তিগত জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশে সমস্যাটা তাই আইনের নীতিগত কাঠামোয় নেই, সমস্যাটা প্রয়োগে; ছোট কোম্পানির জন্য এই আইনই কঠোরভাবে প্রযোজ্য হয়, আর বড় কোম্পানির জন্য একই সংকট রিসিভারশিপ আর বারবার পুনঃতফসিলের নরম কম্বলে ঢাকা পড়ে যায়। এই দ্বৈত মানদণ্ড না ঘুচলে, দেউলিয়া আইন যত আধুনিকই হোক না কেন, তা বাস্তবে কেবল দুর্বলদের জন্যই প্রযোজ্য একটা আইন হয়ে থেকে যাবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

