বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক জোট আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের যোগদানের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক গতি পেয়েছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ১৫ দেশের এই বাণিজ্য জোটের পঞ্চম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ, চিলি, শ্রীলঙ্কা ও হংকংয়ের সদস্যপদের আবেদন পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কার্যদল বা ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ অনুমোদিত হয়েছে।
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার বড় একটি অংশ যখন হাতছাড়া হতে যাচ্ছে, তখন এই এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোটের সদস্য হওয়াকে অত্যন্ত কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রাথমিক সাফল্যকে চূড়ান্ত সদস্যপদ পাওয়ার সমার্থক হিসেবে না দেখে বরং দর-কষাকষি ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির কঠিন সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।
এক প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণে তিনি সতর্ক করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরজা খোলার আগে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করা না গেলে এই জোটের পূর্ণ সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি গতিশীল অর্থনীতিকে নিয়ে গঠিত আরসিইপি কেবল একটি শুল্ক সুবিধা দেওয়ার মঞ্চ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণকারী একটি বিশাল বাজার। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সংকটে বাংলাদেশের সামনে এই জোটে প্রবেশের মাধ্যমে নতুন নতুন রপ্তানি বাজার উন্মোচন, আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া এবং একক তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মতো বিশাল বাণিজ্যিক শক্তির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
তবে অর্থনীতির সরল সমীকরণ অনুযায়ী, কোনো মুক্ত বাণিজ্য জোটের সুবিধা নিতে গেলে নিজস্ব বাজারকেও অন্য সদস্যদের জন্য খুলে দিতে হয়, যা আমদানিনির্ভর বা দুর্বল উৎপাদনী সক্ষমতার দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশাল বাজারের সুবিধা নাকি দেশীয় শিল্পের অস্তিত্বের পরীক্ষা
আরসিইপির চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যেমন সদস্য দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, ঠিক তেমনই চীন বা জাপানের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও উচ্চ সক্ষমতার দেশের পণ্যও কম শুল্কে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে।
আমাদের দেশীয় শিল্প যেখানে এখনো উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, বন্দর ও কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা, লজিস্টিক সংকট এবং জটিল কর ব্যবস্থার কারণে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে জর্জরিত, সেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করা এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
অধ্যাপক সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মূল সমস্যা আরসিইপিতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া নয়; আসল সমস্যা হলো প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর বাজার টিকিয়ে রাখার উপযোগী নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা। শুধুমাত্র বড় বাজারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই, বরং চীন ও আসিয়ানের অতি-প্রতিযোগিতামূলক পণ্যের স্রোতে দেশীয় শিল্প যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিই এখন মূল উদ্বেগের বিষয়।
বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোর বড় দুর্বলতা হলো অতিমাত্রায় পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা এবং একটি জটিল ও অকার্যকর বাণিজ্যনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাণিজ্য নীতিতে অবিলম্বে আমূল সংস্কার এনে উচ্চ শুল্ক ও বিভিন্ন প্যারা-ট্যারিপ (যেমন সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) কমিয়ে একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ককাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এর পাশাপাশি কাস্টমস আধুনিকায়ন, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানো অসম্ভব। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইসিটি খাতের মতো প্রতিশ্রুতিশীল খাতগুলোকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও তথ্যভিত্তিক দর-কষাকষির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা
আরসিইপি কেবল পণ্য কেনাবেচার চুক্তি নয়, এর প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো পুরো অঞ্চলে সেবা খাত ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটানো। ফলে এই আঞ্চলিক উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্র হতে হলে বাংলাদেশকে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন, জ্বালানি নিশ্চয়তা, কোম্পানি আইনের আধুনিকায়ন, মূলধন বা মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে আঞ্চলিক মূলধন আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি না করে বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে প্রবেশ করার যেকোনো চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে।
এই বৃহৎ বাণিজ্য জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের দর-কষাকষির দক্ষতার ওপর।
দর-কষাকষির টেবিলে আবেগ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ডেটা বা তথ্যকে ভিত্তি করতে হবে। কোন কোন পণ্যে দ্রুত শুল্কছাড় পাওয়ার জন্য চাপ দিতে হবে, কোন দুর্বল দেশীয় খাতগুলোকে সুরক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় বা রূপান্তরকালীন ছাড় আদায় করে নিতে হবে এবং কীভাবে দেশীয় শিল্পকে সাময়িক ভর্তুকি দিয়ে ধরে রাখা যাবে; এসব বিষয়ে বিস্তারিত খাতভিত্তিক গবেষণা ছাড়া চু্ক্তিতে সই করলে তা অর্থনীতির জন্য উল্টো বড় ধরণের চাপ নিয়ে আসতে পারে।
পরিশেষে, আরসিইপির সদস্য হওয়ার চলমান এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কেবল একটি নতুন বাণিজ্যিক পথই খুলছে না, এটি দেশের সার্বিক শিল্প উৎপাদনশীলতার সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা নিচ্ছ।
বহির্বিশ্বের বড় বাজারগুলো বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পথে এগোলেও, ঘরের ভেতরের অবকাঠামোগত ঘাটতি ও বাণিজ্যনীতির প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রতিযোগিতা করার মতো পরিবেশ তৈরি করা গেছে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

