মধ্যপ্রাচ্যের টানা সংঘাত থামার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে নতুন করে আশাবাদ ফিরে এসেছে। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়া এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ইঙ্গিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ফের আগ্রহী হয়ে উঠছেন, যার প্রতিফলন পড়েছে বাজারের সূচক ও লেনদেনে।
শুক্রবার লেনদেন শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সূচকগুলোতে ইতিবাচক গতি দেখা যায়। শিল্পখাতভিত্তিক সূচক প্রায় শূন্য দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে বিস্তৃত বাজার সূচক এবং প্রযুক্তিখাতনির্ভর সূচকও প্রায় অর্ধ শতাংশের কাছাকাছি বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বাজারে এই আস্থা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি এবং ইসরায়েল ও লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত মিলেছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে এই উত্থানের পেছনে কিছুটা আবেগনির্ভর বিনিয়োগও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক বিনিয়োগকারী সম্ভাব্য সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত বাজারে প্রবেশ করছেন, যা স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনায় কোনো ব্যত্যয় ঘটলে বাজার আবারও চাপে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
শান্তি প্রত্যাশার প্রভাব শুধু শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, জ্বালানি বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ৯৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর তেলের দাম যেভাবে দ্রুত বেড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
তবে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত থাকায় সরবরাহ চেইনে চাপ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ইউরোপে বিমান জ্বালানির সংকট তৈরি হতে পারে, যা ফ্লাইট পরিচালনায় প্রভাব ফেলবে।
ব্যক্তিগত কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। একটি বড় অনলাইন স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানের শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে, কারণ তাদের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল আয়ের পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। অন্যদিকে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সামান্য বেড়েছে, যা খাতভিত্তিক ভিন্নতার ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপের বাজারেও আংশিক ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। একটি প্রধান ইউরোপীয় সূচক সামান্য বেড়েছে, যদিও আরেকটি সূচক কিছুটা কমেছে। এশিয়ার বাজারে চিত্র ছিল ভিন্নধর্মী। জাপান ও হংকংয়ের সূচক নিম্নমুখী থাকলেও প্রযুক্তিখাতের একটি নতুন কোম্পানি প্রথম দিনের লেনদেনেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নজর কাড়ে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন দুটি বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নীতি। সুদের হার আপাতত স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতির অগ্রগতি বাজারের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আশা বৈশ্বিক অর্থবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই আশাবাদ কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বাস্তব ফলাফলের ওপর।

