নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগমুহূর্তে দেশের পুঁজিবাজারে চরম অস্থিরতার চিত্র দেখা গেছে। দিনের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের ক্রয় আগ্রহে সূচক ও শেয়ারের দামে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা দিলেও শেষ সময়ে বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ লেনদেন শেষে প্রধান শেয়ারবাজারে সূচক পতনের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের আগে বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা—দুই ধরনের মনোভাবই কাজ করেছে। বিশেষ করে বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কোনো প্রণোদনা, কর সুবিধা বা সংস্কারমূলক ঘোষণা আসতে পারে কি না, তা নিয়ে বাজারজুড়ে জল্পনা ছিল। এই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায় দিনের প্রথম ভাগে।
লেনদেন শুরুর পর অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে শুরু করে। ফলে বাজারের প্রধান সূচকও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে চলে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত এই ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত ছিল। তবে দুপুরের পর চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। অনেক বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে কিংবা সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে শেয়ার বিক্রি শুরু করলে বাজারে বিক্রয়চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে।
এর ফলে শেষ ঘণ্টায় একের পর এক শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে এবং সূচকও নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। দিনশেষে মূল্যহ্রাস পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি হয়ে যায়, যা বাজারের সামগ্রিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
দিনের লেনদেন শেষে প্রধান শেয়ারবাজারের সার্বিক সূচক সামান্য কমে ৫ হাজার ৫১৬ পয়েন্টে অবস্থান নেয়। বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর সূচকেও পতন দেখা যায়। যদিও শরিয়াহভিত্তিক সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল, তবুও তা সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিকে ইতিবাচক করতে পারেনি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের আগে এমন দোলাচল অস্বাভাবিক নয়। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সরকারের করনীতি, পুঁজিবাজারবান্ধব পদক্ষেপ, ব্যাংকিং খাতের নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখেন। ফলে বাজেটের আগে অনেকেই নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকেন, আবার কেউ কেউ সম্ভাব্য ইতিবাচক ঘোষণার আশায় আগাম অবস্থান নেন। এই দুই প্রবণতার সংঘর্ষ থেকেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
লেনদেনের পরিমাণেও কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আগের কার্যদিবসের তুলনায় মোট লেনদেন প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে বড় অংশের বিনিয়োগকারী এখনও অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের মিশ্র পরিস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও প্রধান সূচক নিম্নমুখী ছিল। তবে এই বাজারে লেনদেনের পরিমাণ সামান্য বেড়েছে, যা কিছু বিনিয়োগকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বাজেটে বাজারের জন্য কর ছাড়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুবিধা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ থাকলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে প্রত্যাশা পূরণ না হলে স্বল্পমেয়াদে আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাজেট কি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন গতি আনতে পারবে, নাকি অনিশ্চয়তার ধারা আরও দীর্ঘায়িত হবে। সেই উত্তর মিলবে বাজেট ঘোষণার পর বাজারের প্রতিক্রিয়ায়। তবে বাজেটের আগের দিনের লেনদেন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে বিনিয়োগকারীরা এখনো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

