ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রীর নামে শেয়ার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে তাঁর স্ত্রীর নামে বেনিফিশিয়ারি (বিও) হিসাব চালু ছিল। অথচ ডিএসইর চাকরিবিধিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের নির্ধারিত নিকটাত্মীয়দের শেয়ার ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শফিকুল ইসলামের তৎকালীন স্ত্রী মাহবুবা চৌধুরীর নামে সালতা ক্যাপিটালে একটি বিও হিসাব ছিল। হিসাবটি ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সচল ছিল, পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময়ে শফিকুল ইসলাম ডিএসইর তালিকাভুক্তি বিভাগে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডিএসইতে যোগ দেন।
ডিএসইর চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল আট ধরনের নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসায় যুক্ত হতে পারেন না। এই তালিকায় আছেন বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং শ্যালক-শ্যালিকা। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে কারও শেয়ার ব্যবসা বা বিও হিসাব থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়ারও বিধান আছে।
সিডিবিএলের তথ্য বলছে, ওই বিও হিসাব থেকে ফু-ওয়াং ফুড, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, নাভানা সিএনজি, প্রিমিয়ার লিজিং, মালেক স্পিনিং ও বিডি ওয়েল্ডিংসহ একাধিক কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এসব কোম্পানির কয়েকটির শেয়ার নিয়ে অতীতে কারসাজির অভিযোগ উঠেছিল। তবে ওই হিসাবের লেনদেনের সঙ্গে কারসাজির কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
লেনদেনের কথা স্বীকার করে শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন, যখন ওই হিসাব থেকে শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, তখন কর্মকর্তা বা নিকটাত্মীয়দের শেয়ার লেনদেন নিয়ে ডিএসইর কোনো সার্কুলার ছিল না। এ-সংক্রান্ত সার্কুলার আসার পর হিসাবটি বন্ধ করা হয়েছে। তাঁর আরও বক্তব্য, মাহবুবা চৌধুরী এখন আর তাঁর স্ত্রী নন। তবে নিয়োগপত্রে দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বা তাঁর নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসায় যুক্ত হতে পারবেন না। অর্থাৎ সার্কুলার না থাকার যুক্তি থাকলেও নিয়োগপত্রের শর্তের বিষয়টি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৬ সালে রহিমা ফুডের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আটকে রাখার অভিযোগে তাঁকে ডিএসইর তালিকাভুক্তি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে আর ওই বিভাগে পদায়ন করা হয়নি।
ডিএসইর একজন কর্মকর্তার দাবি, সিআরও শফিকুল ইসলামের প্রতি ডিএসইর দুজন পরিচালকের ‘আশীর্বাদের হাত’ রয়েছে। এ কারণেই এত বছরেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা মনে করেন। তবে এ অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আল-আমিন বলেন, বিষয়টি ডিএসইর খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইনে নির্ধারিত শাস্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, স্বার্থের সংঘাত এড়াতেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেউ যদি পদ বা দায়িত্বের সুবাদে অভ্যন্তরীণ তথ্য জানতে পারেন এবং তা কাজে লাগিয়ে লেনদেন করেন, তবে বাজারে প্রভাব বিস্তার বা কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে যথাযথ পদক্ষেপ জরুরি।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, কর্মীদের কাছ থেকে এখন স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত ঘোষণা নেওয়া শুরু হয়েছে। এই ঘোষণায় কর্মীর স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিদের কোথাও কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা বা অ্যাকাউন্ট আছে কি না, তা পূর্ণাঙ্গভাবে জানাতে হয়। সার্ভিস রুলেও এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান আছে। কর্মীর কোনো নির্ভরশীল ব্যক্তি ডিএসইতে হিসাব খুলতে বা লেনদেন করতে পারবেন না। এরপরও কারও ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আইন অনুযায়ী ডিএসইর কোনো কর্মকর্তা বা তাঁর নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসা করতে পারেন না। কেউ এমনটি করলে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন দুটি প্রশ্নের মুখে। প্রথমত, নিয়োগপত্রের শর্ত থাকা সত্ত্বেও এমন লেনদেন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, একটি এক্সচেঞ্জের শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না। বিএসইসির তদন্তই ঠিক করবে, এটি শুধু নিয়মভঙ্গের বিষয় নাকি এর চেয়েও গুরুতর কিছু।
তথ্যসূত্র: কালবেলা

