কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক ঋণ ও বন্ডবাজারে। বিপুল পরিমাণ ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করছে।
এই অর্থ সংগ্রহে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউরোপ, জাপান ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের বন্ডবাজার থেকেও সক্রিয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বড় করপোরেট বন্ডবাজারের বাইরে থাকা ছোট ও মাঝারি বাজারগুলো এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের বন্ডবাজারে প্রযুক্তি কোম্পানির উপস্থিতি বাড়ছে।
গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট ইতোমধ্যে ব্রিটিশ পাউন্ড ও সুইস ফ্রাঁ ভিত্তিক করপোরেট বন্ডবাজারে বড় ঋণগ্রহীতায় পরিণত হয়েছে। একই সময়ে ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন গত মার্চে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো সংগ্রহ করেছে। ইউরোপীয় করপোরেট বন্ডবাজারে ইউরো ভিত্তিক বন্ড বিক্রির ক্ষেত্রে এটিকে এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহৎ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এআই অবকাঠামো নির্মাণে আগামী কয়েক বছরে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, যা ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এই বিশাল অর্থের জোগান নিশ্চিত করতেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন একক বাজারের ওপর নির্ভর না করে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করছে।
তাদের মতে, বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহণের একটি বড় সুবিধা হলো বিভিন্ন দেশে থাকা সম্পদের সঙ্গে মুদ্রা ঝুঁকির ভারসাম্য রাখা যায়। পাশাপাশি ইউরোপের মতো অঞ্চলে তুলনামূলক কম সুদে অর্থ ধার করার সুযোগও রয়েছে। ফরাসি ব্যাংক বিএনপি পারিবাসের একজন কর্মকর্তা জিউলিও বারাটা বলেন, বর্তমান বিনিয়োগের গতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যেই এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্ড ইস্যুকারীদের তালিকায় চলে আসতে পারে।
ইউরোপীয় বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের বড় আকারের বন্ড বিক্রির কারণে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের বাইরে থাকা কোম্পানিগুলোর ইউরো ভিত্তিক ঋণ সংগ্রহ ৬০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর শুধু ইউরো ভিত্তিক বাজার থেকেই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ সংগ্রহ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগে এসব বাজারে এত বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইউরোসহ বিভিন্ন বাজারের গভীরতা ও সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যেই নয়, অন্যান্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যারা এখন বিদেশি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
একই সময়ে বিনিয়োগকারীদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছেন। ফলে বিভিন্ন মুদ্রাভিত্তিক বন্ডে আগ্রহ বাড়ছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্যও এতে সুবিধা রয়েছে। বিদেশি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারে যেতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সুদে বা কাছাকাছি খরচে অর্থ পাওয়া যায়। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও থাকে।
অতিরিক্ত ঋণ নিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ আর্থিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এতে তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বন্ড কেনায় সতর্ক হন, যার প্রভাব পড়ে বন্ডের দামে এবং কখনো কখনো রিটার্নেও। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা এআই খাতের প্রবৃদ্ধির সুযোগ নিতে আগ্রহী। ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে প্রযুক্তি খাতের উপস্থিতি আগে সীমিত থাকলেও এখন অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের বন্ডের মাধ্যমে তারা এই খাতে অংশ নেওয়ার নতুন সুযোগ পাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর বিনিয়োগের এই ঢেউ এখন শুধু প্রযুক্তি খাতে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক ঋণবাজারেও। প্রযুক্তি জায়ান্টদের নতুন অর্থ সংগ্রহ কৌশল আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারকে আরও সক্রিয় ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।

