একসময় দেশের বাজারকেন্দ্রিক উদ্যোগ হিসেবেই পরিচিত ছিল বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রযুক্তি স্টার্টআপ। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। এখন ঢাকায় গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রাহক তৈরি করছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়; বরং বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
সম্প্রতি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসা-ভিত্তিক ডিজিটাল কমার্স প্ল্যাটফর্ম শপআপ মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ বি-টু-বি মার্কেটপ্লেস সারির সঙ্গে একীভূত হয়ে ‘সিল্ক গ্রুপ’ নামে নতুন যাত্রা শুরু করেছে। প্রায় ১১ কোটি ডলারের বিনিয়োগে সম্পন্ন হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্রুত বিস্তৃত একটি বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ছয় লাখেরও বেশি ব্যবসায়িক গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন আর কেবল স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তারা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে দেশের একাধিক স্টার্টআপ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের সক্ষমতা দেখাচ্ছে। কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এয়ারওয়ার্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শত শত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। সফটওয়্যারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাপ্লয়ে ৬০টির বেশি দেশে গ্রাহক তৈরি করেছে। ওয়েবসাইট নির্মাণ প্ল্যাটফর্ম ডোরিক এক লাখের বেশি ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছেছে। অনলাইন শিক্ষা ও কনটেন্ট ব্যবসা প্ল্যাটফর্ম ইজিকোর্স বৈশ্বিক বাজারে সুপরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে।
ভ্রমণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গোজায়ান বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পাকিস্তানের বাজারে প্রবেশ করেছে। বিপণন প্রযুক্তি কোম্পানি মার্কোপোলো যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম মনশা উত্তর আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের সেবা দিচ্ছে। গ্রাহক যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইঅ্যালিস মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে পরিবহন ও লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম পাঠাও বাংলাদেশ ও নেপাল—দুই দেশেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খেয়াল করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়া অধিকাংশ বাংলাদেশি স্টার্টআপের মূল ভিত্তি সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি। কারণ এসব পণ্য সীমান্ত অতিক্রম করতে গুদাম, পরিবহন বা শুল্ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। ফলে একটি সফটওয়্যার পণ্য বিশ্বের যেকোনো দেশে তুলনামূলক কম খরচে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
স্টার্টআপ বিশ্লেষকদের মতে, সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, তারা শুরু থেকেই পণ্যকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়েছে। অর্থাৎ সেবা বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে পরে সফটওয়্যার বানানোর চেষ্টা করেনি; বরং শুরু থেকেই একটি স্কেলযোগ্য প্রযুক্তি পণ্য তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশে নিবন্ধিত করপোরেট কাঠামো তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর বা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিবন্ধন তাদের বৈশ্বিক বিনিয়োগ, পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং করপোরেট গ্রাহক অর্জনে সহায়তা করেছে।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠাতাদের দক্ষতার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে ধারণা—এই তিনটির সমন্বয় যেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল, তারা তুলনামূলক দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে।
চতুর্থত, তারা এমন বাজার বেছে নিয়েছে যেখানে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার বাজারে না গিয়ে অবহেলিত বা দ্রুত বিকাশমান খাতকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদকে। প্রতিবছর দেশে কয়েক লাখ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি স্নাতক কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। দেশের প্রকৌশলীরা বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতেও কাজ করছেন। অথচ উন্নত দেশের তুলনায় একই মানের প্রযুক্তি কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশে খরচ অনেক কম।
এই ব্যয়গত সুবিধাই এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকের কাছে মাসিক সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সফটওয়্যার বিক্রি করে ঢাকায় বসে প্রযুক্তি দল পরিচালনা করলে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। ফলে অতিরিক্ত মুনাফা গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোর জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অঞ্চল। কারণ এসব অঞ্চলে ডিজিটাল বাণিজ্য, আর্থিক প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব দেশের অনেক সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার মিল রয়েছে। ফলে স্থানীয় অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেখানে দ্রুত সমাধান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
মাইঅ্যালিসের উদাহরণ উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপভিত্তিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, সেটি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও সমানভাবে কার্যকর হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশে তৈরি ভ্রমণ প্রযুক্তি সমাধান পাকিস্তানের বাজারেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
শুধু বাজার নয়, বিনিয়োগের উৎসও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে অধিকাংশ স্টার্টআপ পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এখন মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন তহবিল বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগও বাড়ছে।
তবে আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় বাজারে সাফল্য পাওয়ার পর অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আবার অনেকেই বৈশ্বিক বিপণন ও গ্রাহক অর্জনের কৌশল ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারে না।
সফল প্রতিষ্ঠানগুলো দেখিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু ভালো পণ্য যথেষ্ট নয়; গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর কৌশলও প্রয়োজন। অনলাইন কমিউনিটি, সার্চ ইঞ্জিন, পণ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ‘বাংলাদেশ থেকে কি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান তৈরি সম্ভব’—এই প্রশ্নের উত্তর ইতোমধ্যে মিলেছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, এই সাফল্যের ধারাকে কত দ্রুত আরও বিস্তৃত করা যায়।
শপআপের আঞ্চলিক সম্প্রসারণ, মার্কোপোলোর বৈশ্বিক স্বীকৃতি, মনশার আন্তর্জাতিক অ্যাক্সিলারেটরে অংশগ্রহণ কিংবা পাঠাওয়ের বিদেশি বিনিয়োগ—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।
যদি দক্ষ জনশক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারমুখী কৌশল একই গতিতে এগিয়ে যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ শুধু শ্রম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও নতুন পরিচয় পেতে পারে।

