কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রযুক্তির আলোচনার বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে শহর, গ্রাম, পরিবেশ, বিদ্যুৎব্যবস্থা, পানির ব্যবহার এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করছে। আমরা যখন কোনো প্রশ্ন করি, ছবি বানাই, অনুবাদ করি, লেখা তৈরি করি বা কোনো বুদ্ধিমান সফটওয়্যারের সহায়তা নিই, তখন পর্দার পেছনে বিশাল পরিমাণ হিসাব–নিকাশ চলে। সেই কাজ হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বড় বড় তথ্যকেন্দ্রে।
এই তথ্যকেন্দ্রগুলো বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ শিল্প স্থাপনার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে থাকে হাজার হাজার শক্তিশালী যন্ত্র, বিশেষ ধরনের গণনাযন্ত্র, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং অবিরাম বিদ্যুৎ সরবরাহের আয়োজন। এগুলো দিন–রাত বন্ধ না হয়ে কাজ করে। ফলে এগুলো শুধু বিদ্যুৎ খরচ করে না, বিপুল তাপও তৈরি করে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই তাপ শুধু ভবনের ভেতরে আটকে থাকে না; আশপাশের ভূমির তাপমাত্রাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বড় তথ্যকেন্দ্রগুলোর কারণে আশপাশের ভূমির তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষকেরা এই ঘটনাকে বলছেন “তথ্য–তাপ দ্বীপ” প্রভাব। বিষয়টি অনেকটা শহুরে তাপ দ্বীপের মতো, যেখানে ঘন ভবন, রাস্তা, যানবাহন ও মানব কার্যকলাপের কারণে শহর তার আশপাশের এলাকার চেয়ে বেশি গরম হয়ে ওঠে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে তথ্যকেন্দ্রের প্রয়োজন। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লদের মতো সেবা ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীর অনুরোধ সরাসরি কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত যন্ত্রে সমাধান হয় না। সেই অনুরোধ যায় বিশাল তথ্যকেন্দ্রে, যেখানে শক্তিশালী চিপ একসঙ্গে হাজার হাজার গণনা করে। বড় ভাষা মডেল বা উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা চালাতে সাধারণ ওয়েবসেবা চালানোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তথ্যকেন্দ্রগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। এটি ছিল বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১.৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এই খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বার্ষিক বৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার কেবল ডিজিটাল জগতের পরিবর্তন নয়; এটি শক্তি খাতের ওপরও বড় চাপ তৈরি করছে।
সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ করে অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্রগুলো। এগুলো সাধারণত বড় মেঘভিত্তিক সেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়। আইবিএমের বর্ণনা অনুযায়ী, এমন একটি অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্রে সাধারণত অন্তত ৫,০০০ সার্ভার থাকে এবং এর আয়তন কমপক্ষে ১০,০০০ বর্গফুট বা প্রায় ৯৩০ বর্গমিটার হয়। তবে বাস্তবে অনেক কেন্দ্র এর চেয়ে অনেক বড়।
একটি অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্র সচল রাখতে সাধারণত ১০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। এটি কোনো ক্ষুদ্র ব্যবহার নয়। এত বিদ্যুৎ দিয়ে বহু ঘরবাড়ি, এমনকি ছোট শহরের বড় অংশ চালানো সম্ভব। এই বিদ্যুৎ যন্ত্রগুলোকে সচল রাখে, আর সেই যন্ত্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে তাপ উৎপাদন করে। তাই তথ্যকেন্দ্রের জন্য শীতলীকরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শীতলীকরণ নিজেও নতুন সমস্যা তৈরি করে, কারণ এতে বিপুল পানি দরকার হয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের ডিজিটাল স্থায়িত্ববিষয়ক উপদেষ্টা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্র বছরে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করতে পারে। এটি প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন গ্যালনের সমান। তুলনার জন্য বলা যায়, এই পরিমাণ পানি প্রায় ৮০,০০০ মানুষের বার্ষিক চাহিদার সমতুল্য। ফলে যেখানে পানির সংকট আছে, সেখানে এমন তথ্যকেন্দ্র স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সক্রিয় তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ১১,৬০০–এর বেশি। এর সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তথ্যকেন্দ্রের অবস্থান অনুসরণকারী বৈশ্বিক উপাত্তভান্ডারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ৪,৩০০–এর বেশি। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেঘভিত্তিক সেবা পরিচালনার প্রধান অবকাঠামো এখনো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক।
ইউরোপও বড় কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত এগিয়েছে। যুক্তরাজ্যে ৫৪০–এর বেশি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে, যার বড় অংশ লন্ডন ও আশপাশে কেন্দ্রীভূত। জার্মানিতে রয়েছে ৫২০–এর বেশি এবং ফ্রান্সে ৩৯০–এর বেশি তথ্যকেন্দ্র। এশিয়ায় চীন ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। চীনে ৩৬০–এর বেশি এবং ভারতে ৩০০–এর বেশি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়াও দ্রুত বাড়ছে, কারণ ওই অঞ্চলে মেঘসেবা ও ডিজিটাল সক্ষমতার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। সিনার্জি রিসার্চ গ্রুপের হিসাবে, ২০২১ সাল থেকে বিশ্বে অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭০০, আর এখন তা বেড়ে ১,২৯৭–এ পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধির বড় কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেঘভিত্তিক সেবা, তথ্য সংরক্ষণ, অনলাইন বিনোদন, ব্যবসায়িক স্বয়ংক্রিয়তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তাপ। কেমব্রিজ, নানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা দেখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্র চালুর পর আশপাশের ভূমির তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ১০ কিলোমিটার বা প্রায় ৬ মাইল দূর পর্যন্ত শনাক্ত করা গেছে। অর্থাৎ তথ্যকেন্দ্রের তাপ কেবল দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আশপাশের মাটি, বসতি, শিল্প এলাকা ও স্থানীয় জলবায়ুকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষণায় ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাসার উপগ্রহভিত্তিক ভূমি তাপমাত্রার উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ১১,০০০–এর বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্রের অবস্থান মিলিয়ে দেখা হয়েছে। গবেষকেরা বিশেষভাবে ৬,৭৩৩টি এমন কেন্দ্র বিশ্লেষণ করেছেন, যেগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে অবস্থিত। প্রতিটি কেন্দ্র চালুর পরবর্তী মাসগুলোর তাপমাত্রা একই স্থানের আগের পাঁচ বছরের গড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
ফলাফল ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পাওয়া গেছে। গড় বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও সর্বোচ্চ বৃদ্ধি অনেক বেশি। স্থানীয় পরিবেশের জন্য ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছোট পরিবর্তন নয়। বিশেষ করে যেখানে আগে থেকেই গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎ সংকট বা পানির চাপ রয়েছে, সেখানে এই অতিরিক্ত উষ্ণতা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তথ্যকেন্দ্রের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী ৩৪০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে পড়তে পারে। এই সংখ্যা খুবই বড়। কারণ তথ্যকেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের কেন্দ্রের বাইরে, শিল্পাঞ্চল বা আধা–নগর এলাকায় তৈরি হলেও সেগুলোর আশপাশে শ্রমজীবী মানুষ, ছোট শহর, কৃষিজমি, স্কুল, হাসপাতাল বা আবাসিক এলাকা থাকতে পারে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই আসে। সরাসরি প্রভাব হলো আশপাশের এলাকা বেশি গরম অনুভূত হওয়া। এতে গরমের দিনে মানুষের অস্বস্তি বাড়ে, তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়। পরোক্ষ প্রভাব হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের চাহিদা বাড়া। মানুষ গরম কমাতে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর আরও চাপ পড়বে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে নিঃসরণও বাড়তে পারে।
পানির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যকেন্দ্রগুলো যন্ত্র ঠান্ডা রাখতে উন্নত তরল শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থায় পানি বা অন্যান্য শীতল তরল ব্যবহৃত হয়। শুষ্ক অঞ্চল বা পানি–সংকটপূর্ণ এলাকায় বড় তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করলে কৃষি, স্থানীয় বাসিন্দা ও শিল্প খাতের সঙ্গে পানির প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় প্রযুক্তি উন্নয়নের নামে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানি নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় না।
এখানে একটি বড় নৈতিক প্রশ্নও আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা ভোগ করেন সারা বিশ্বের ব্যবহারকারী, বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও ডিজিটাল অর্থনীতির অংশীদারেরা। কিন্তু এর পরিবেশগত চাপ অনেক সময় বহন করে নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ। কোনো অঞ্চলে তথ্যকেন্দ্র বসানো হলে সেখানে চাকরি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় তাপ, পানি ব্যবহার, ভূমি ব্যবহার ও বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ে। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য না রাখলে প্রযুক্তির লাভ একদিকে যাবে, আর ক্ষতি অন্যদিকে জমা হবে।
বিনিয়োগের পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়, এই খাত আরও বড় হতে যাচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট ও মেটা—এই চার বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূলধনী ব্যয় ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থের বড় অংশ যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎব্যবস্থা, চিপ, সংযোগ ও শীতলীকরণ প্রযুক্তিতে।
বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে লুইজিয়ানায় মেটার ২৭ বিলিয়ন ডলারের হাইপেরিয়ন ক্যাম্পাস। উইসকনসিনে মাইক্রোসফটের বহু ধাপের ২০ বিলিয়ন ডলারের তথ্যকেন্দ্র সম্প্রসারণ প্রকল্প রয়েছে। মিসিসিপিতে অ্যামাজন ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে তথ্যকেন্দ্র অবকাঠামোয়। মিসৌরির নিউ ফ্লোরেন্সে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্পেড অতিবৃহৎ তথ্যকেন্দ্র ক্যাম্পাস হিসেবে পরিকল্পিত। টেক্সাসের অ্যাবিলিনে ওরাকলের প্রকল্প স্টারগেট ওপেনএআই–এর জন্য তৈরি একটি বিশাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সুপারক্লাস্টার, যার মোট ক্ষমতা ১.২ গিগাওয়াট থেকে ২ গিগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
এ ধরনের প্রকল্প দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু সফটওয়্যার বা মডেলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি জমি, বিদ্যুৎ, পানি, শীতলীকরণ, নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় অনুমোদনের প্রতিযোগিতাও। যে কোম্পানি দ্রুত বেশি অবকাঠামো তৈরি করতে পারবে, সে ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দৌড়ের পরিবেশগত হিসাব কে রাখবে?
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষ শীতলীকরণ, কার্বন হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব নকশার কথা বলে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শুধু বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ স্থানীয় তাপ, পানি ব্যবহার, ভূমি পরিবর্তন এবং আশপাশের মানুষের জীবনমানের প্রশ্ন আলাদা। একটি তথ্যকেন্দ্র বৈশ্বিক কার্বন হিসাবের দিক থেকে তুলনামূলক ভালো হলেও স্থানীয়ভাবে তাপ ও পানির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের তথ্যকেন্দ্র নীতিতে কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, কোথায় তথ্যকেন্দ্র তৈরি হবে তা শুধু জমির দাম ও বিদ্যুৎ সুবিধা দেখে নির্ধারণ করা উচিত নয়; স্থানীয় তাপমাত্রা, পানি প্রাপ্যতা, জনবসতি, কৃষি, বাস্তুতন্ত্র ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিবেচনায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাপ পুনর্ব্যবহার করার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কিছু দেশে তথ্যকেন্দ্রের অতিরিক্ত তাপ কাছাকাছি ঘরবাড়ি, গ্রিনহাউস বা শিল্প কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। এই ধরনের ব্যবস্থা বাড়ালে অপচয় কমতে পারে।
তৃতীয়ত, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের আগে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শ জরুরি। অনেক সময় বড় প্রযুক্তি প্রকল্প স্থানীয় মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হয় দূরের কার্যালয়ে। স্বচ্ছতা না থাকলে আস্থা কমে। তথ্যকেন্দ্র কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, কত পানি লাগবে, কী ধরনের শীতলীকরণ হবে, স্থানীয় তাপমাত্রায় কী প্রভাব পড়তে পারে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষের জানার অধিকার আছে।
চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত খরচও হিসাব করতে হবে। আমরা যখন দ্রুত, সহজ ও শক্তিশালী ডিজিটাল সেবা পাই, তখন তার পেছনের অবকাঠামো অদৃশ্য থাকে। কিন্তু অদৃশ্য মানে খরচহীন নয়। প্রতিটি গণনার পেছনে বিদ্যুৎ আছে, যন্ত্র আছে, পানি আছে, তাপ আছে এবং কোনো না কোনো অঞ্চলের পরিবেশগত চাপ আছে।
এখন প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি থেমে যাবে? বাস্তবতা হলো, তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, গবেষণা, প্রতিরক্ষা, কৃষি, বিনোদন ও প্রশাসনে আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়বে। তাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অযৌক্তিক সম্প্রসারণ নয়, বরং দায়িত্বশীল অবকাঠামো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বড় হবে, তার ভৌত ভিত্তিও তত বড় হবে। সেই ভিত্তি যদি বিদ্যুৎ, পানি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে, তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এই গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভার্চুয়াল হলেও তার প্রভাব বাস্তব। ব্যবহারকারীর পর্দায় যে উত্তর কয়েক সেকেন্ডে আসে, তার পেছনে পৃথিবীর কোথাও কোনো তথ্যকেন্দ্র কাজ করছে, বিদ্যুৎ খরচ করছে, পানি ব্যবহার করছে এবং তাপ ছড়াচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আলোচনা শুধু দ্রুততা, দক্ষতা ও লাভ নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর সঙ্গে থাকতে হবে পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ন্যায়সঙ্গত উন্নয়নের প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে শুধু এটি কত বুদ্ধিমান, কত দ্রুত বা কত লাভজনক—এসব দিয়ে নয়। মূল্যায়ন হবে এটি কতটা টেকসই, কতটা ন্যায্য এবং কতটা দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপরও। তথ্যকেন্দ্রের তাপ আমাদের সেই অদৃশ্য বাস্তবতা দেখাচ্ছে, যা এতদিন অনেকটাই পর্দার আড়ালে ছিল।

