বাংলাদেশজুড়ে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি দপ্তরে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের অন্যতম বৃহৎ ‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এস্টাবলিশমেন্ট’ প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম এবং দুর্বল তদারকির কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাড়ে চার বছর পার হলেও প্রকল্পের মাত্র ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর প্রায় ৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রকল্পের বাজেটেও বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে পরিকল্পিত ঋণচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল বাজেট থেকে ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকারও বেশি কমানো হয়েছে।
সরকারের ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিভিশন (আইএমইডি) জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ক্রয়প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিক ধীরগতি। ২০২২ সালের আগস্টে দরপত্র আহ্বান করা হলেও চুক্তি স্বাক্ষর করতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। অর্থাৎ একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ মাস লেগেছে শুধু ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করতে। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব মূল্যায়নেও একের পর এক বৈঠক হলেও সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার বাইরে গিয়ে চুক্তি দেওয়া, নির্ধারিত প্রতিবেদন ছাড়া পরামর্শক নিয়োগ, অনুমোদিত সীমার বাইরে ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ খরচ, পণ্য সরবরাহের আগেই অর্থ পরিশোধ এবং সম্পদের যথাযথ যাচাই না করার মতো নানা অনিয়ম ঘটেছে।
২০২৪ অর্থবছরে নিরীক্ষকরা ১৬টি আপত্তি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রাউটার কেনাকাটায় অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের কারণে ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভবন সংস্কার ও ঠিকাদারি কাজেও অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২৫ অর্থবছরে আপত্তির সংখ্যা কিছুটা কমে ১১টিতে নামলেও অপটিক্যাল ফাইবার কেবল কেনাকাটায় ৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকার অনিয়মিত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ উঠে এসেছে।
যদিও কয়েকটি আপত্তি আংশিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, অধিকাংশ অভিযোগ এখনও ঝুলে রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকল্পে কোনো অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা হয়নি, ফলে জবাবদিহি ও তদারকি কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটিও তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ইন্টারনেট সেবা কেনা ও পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থা প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবা গ্রহণের সুযোগ সীমিত করেছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাজার থেকে ভালো ও সাশ্রয়ী সেবা নিতে পারছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগের গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৩২৬ টাকা, যা বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে সংযোগ সম্প্রসারণ হলেও সেবার মান নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ধীরগতির ইন্টারনেট, বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অস্থিতিশীল নেটওয়ার্কের কারণে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি অফিসের অনলাইন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে কয়েকটি উপজেলা আইসিটি ভবনে ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও প্লাম্বিং সমস্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক স্থানে রাউটার ও ইন্টারনেট সংযোগও অকার্যকর বা আংশিক সচল অবস্থায় রয়েছে।
আইএমইডি আরও জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থার পরিবর্তে অফলাইনে ক্রয়প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা কমিয়েছে। কোথাও কোথাও দরপত্র খোলা থেকে চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত ৪৮ থেকে ৫২ দিন সময় লেগেছে, যা গ্রহণযোগ্য সময়সীমার চেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের টেকসই বাস্তবায়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ক্রয়বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ, নিয়মিত সম্পদ যাচাই এবং নিরীক্ষা আপত্তিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে ক্রয় ও সেবা ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ, সব ধরনের ক্রয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ই-জিপি ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

