বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো এক্সট্রিম-আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি। এই প্রযুক্তির মেশিন তৈরির একমাত্র প্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল। চীনে এমন একটি মেশিন গোপনে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন নিজস্ব ইইউভি প্রযুক্তি তৈরিতে কতটা এগিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিকের দাবি, অত্যন্ত সংবেদনশীল ইইউভি মেশিনের একটি হয়তো গোপন পথে চীনে পৌঁছে গেছে। তবে এএসএমএল এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। কোম্পানিটির ভাষ্য, এখন পর্যন্ত উৎপাদিত ৩৪০টি ইইউভি মেশিনের অবস্থান সম্পর্কে তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি মেশিন অকার্যকর। কোনো মেশিনই চীনে নেই বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এএসএমএলের দাবি, ইইউভি মেশিন পরিবহনের দায়িত্ব শুধু তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকে এবং এগুলো সার্বক্ষণিক অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারখানায় মেশিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ স্থাপনের কাজও এএসএমএলের নিজস্ব প্রকৌশলীরা করেন।
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, চীনে কোনো ইইউভি মেশিনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রাংশও তারা কখনো পাঠায়নি। মার্কিন প্রশাসনের কাছে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছে এএসএমএল।
ইইউভি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ
উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী চিপ তৈরিতে ইইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। চীনের উন্নত চিপ উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সাল থেকে এএসএমএলের ইইউভি মেশিন চীনে রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে।
ডাচ সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। জুনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরে ডাচ বাণিজ্যমন্ত্রী সোয়ার্ড সোয়ার্ডসমা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ইইউভি প্রযুক্তিসহ সংবেদনশীল প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নেদারল্যান্ডস কঠোরভাবেই প্রয়োগ করে।
লাটনিকের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সোয়ার্ডসমা বলেন, ডাচ সরকার তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু করেনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, তদন্ত বা বিচার করার মতো কোনো বিষয় পাওয়া গেলে তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নিতেন।
তবে লাটনিকের দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ না থাকলেও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যকে ‘অযাচাইকৃত’, কিন্তু পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয় বলে বর্ণনা করেছেন।
শিল্প খাতের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এএসএমএলের তৈরি একটি সম্পূর্ণ ইইউভি মেশিন গোপনে চীনে পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তবে কিছু যন্ত্রাংশ এএসএমএলের সরবরাহকারী কিংবা তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে চীনে পৌঁছে থাকতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
পুরোনো ডিইউভি প্রযুক্তিই কি আসল উদ্বেগ
মার্কিন উদ্বেগের আরেকটি কারণ হতে পারে এএসএমএলের পুরোনো প্রযুক্তির ডিপ-আল্ট্রাভায়োলেট বা ডিইউভি মেশিন। এগুলো ইইউভি মেশিনের মতো একই ধরনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। ২০২৫ সালে এএসএমএলের মোট আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চীনে ডিইউভি মেশিন ও সেবা বিক্রি থেকে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ও এসএমআইসি ‘মাল্টি-প্যাটার্নিং’ কৌশলের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটারের চেয়েও ক্ষুদ্র চিপ তৈরি করেছে। এ পদ্ধতিতে ইইউভির তুলনায় উৎপাদন খরচ ও ত্রুটি বেশি হলেও এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ উন্নত চিপ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা।
চীনের নিজস্ব ইইউভি তৈরির চেষ্টা
চীনের নিজস্ব ইইউভি প্রযুক্তি তৈরির প্রচেষ্টাও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সাবেক এএসএমএল প্রকৌশলীদের একটি দল ২০২৫ সালে চীনে একটি ইইউভি মেশিনের প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। শেনঝেনের একটি উচ্চনিরাপত্তার গবেষণাগারে সেটি পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এএসএমএল জানিয়েছে, তাদের সাবেক কর্মীরা বর্তমানে কোথায় কাজ করছেন, তা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে কর্মীদের গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তি রয়েছে এবং ব্যবসায়িক গোপনীয়তা চুরির অভিযোগে কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলভাবে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছে।
চীনের তৈরি ওই প্রোটোটাইপ এখনো কার্যকর চিপ উৎপাদনে সক্ষম হয়নি। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে কার্যকর চিপ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এই সময়সীমাকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, কার্যকর ইইউভি মেশিন তৈরি করতে চীনের এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা স্বীকার করছেন, ইইউভি ও বিকল্প প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের মধ্যেও বাড়ছে টানাপোড়েন
চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ শুধু বেইজিংয়ের সঙ্গেই নয়, ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গেও টানাপোড়েন তৈরি করছে। ওয়াশিংটনের ধারণা, চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত করতে ইউরোপকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করার চাপের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থও এগিয়ে নিতে চাইছে।
চীনা চিপ প্রযুক্তির অগ্রগতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে একটি নতুন জোট গঠন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেদারল্যান্ডসসহ ২৪টি পক্ষ স্বাক্ষর করেছে। জোটটির মাধ্যমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিনিময় এবং ইইউভি-সংশ্লিষ্ট রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি গত এপ্রিলে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে দ্বিদলীয় সমর্থনে ‘ম্যাচ অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে চীনে নতুন ডিইউভি মেশিন বিক্রির পাশাপাশি দেশটিতে থাকা পুরোনো শত শত মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহও নিষিদ্ধ হতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নেদারল্যান্ডস এসব বিধিনিষেধ না মানলে ‘ফরেন ডিরেক্ট প্রোডাক্ট রুল’-এর মাধ্যমে এএসএমএলের ওপর জরিমানা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সমর্থকদের যুক্তি, চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করায় এমন কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে নেদারল্যান্ডসের জন্য বিষয়টি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও হয়ে উঠেছে। ডাচ বাণিজ্যমন্ত্রী সোয়ার্ডসমা জানিয়েছেন, ডাচ কোম্পানির ওপর মার্কিন আইন জোর করে প্রয়োগের বিষয়টি তারা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
ডাচদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কথিত বৈপরীত্য। একদিকে ওয়াশিংটন চীনে পুরোনো ডিইউভি প্রযুক্তি বিক্রির ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এনভিডিয়ার এইচ২০০ এআই চিপ চীনে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেদারল্যান্ডসের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চীন-নেদারল্যান্ডস সম্পর্কেও চাপ
চীন-নেদারল্যান্ডস সম্পর্কের ওপরও প্রযুক্তি-নির্ভর এই বিরোধের প্রভাব পড়ছে। চীনা মালিকানাধীন ডাচ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নেক্সপেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর বেইজিং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ইউরোপীয় ও জাপানি গাড়ি নির্মাতারা সরবরাহ-সংক্রান্ত সমস্যায় পড়ে।
সব মিলিয়ে, ইইউভি মেশিন চীনে গোপনে পৌঁছানোর মার্কিন অভিযোগের পক্ষে এখনো প্রকাশ্য প্রমাণ না থাকলেও ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান প্রতিযোগিতাকে সামনে এনেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন নিজস্ব উন্নত চিপ তৈরির প্রযুক্তিতে কত দ্রুত এগোতে পারে। সেই সক্ষমতা যত বাড়বে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও তত বড় প্রশ্ন তৈরি হবে। সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট

