বিশ্বের এক প্রান্তে একজন নারী বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। অন্য প্রান্তে, বাংলাদেশে এখনো নারী বাসচালক হতে পারবেন কি না সেই প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক, বিদ্রূপ ও সামাজিক বাধা তৈরি হয়। এই দুই বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানই যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি: আমরা কি নারীর সক্ষমতাকে তার যোগ্যতা দিয়ে বিচার করি, নাকি তার লিঙ্গ দিয়ে?
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির অধ্যাপক এবং মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার মেডিকেল ডিরেক্টর প্রফেসর জর্জিয়া লং এর নেতৃত্বে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা কাস্টমাইজড mRNA-ভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ Phase 3 ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্প্রতি বড় সাফল্যের খবর দিয়েছে। উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর এই চিকিৎসা ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে উল্লেখযোগ্য ফল দেখিয়েছে।
এটি প্রচলিত অর্থে সবার জন্য একই ধরনের প্রতিরোধমূলক টিকা নয়। বরং রোগীর নিজের টিউমারের জিনগত পরিবর্তন বা ‘মিউটেশনাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বিশ্লেষণ করে তার জন্য আলাদা mRNA-ভিত্তিক চিকিৎসা তৈরি করা হয়। সেই তথ্য ব্যবহার করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত ও আক্রমণ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই চিকিৎসা pembrolizumab-এর সঙ্গে ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়েছে।
১ হাজারের বেশি রোগীকে নিয়ে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক Phase 3 গবেষণা নতুন আশা তৈরি করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি এখনো সবার জন্য বাজারে পাওয়া কোনো অনুমোদিত টিকা নয়। গবেষণার ফল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে উপস্থাপন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। তাই একে ‘ক্যান্সার সম্পূর্ণ সারিয়ে দেওয়ার টিকা’ বলার চেয়ে ক্যান্সার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার সম্ভাব্য নতুন যুগ হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
এক নারীর সাফল্য, গোটা বিশ্বের জন্য বার্তা
জর্জিয়া লংয়ের গল্প শুধু একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে নারী কেবল প্রচলিত পেশার সীমানা ভাঙেন না, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারেন।
বিজ্ঞান, চিকিৎসা, বিমানচালনা, প্রকৌশল, মহাকাশ গবেষণা কিংবা গণপরিবহন কোনো ক্ষেত্রই জন্মগতভাবে পুরুষের জন্য সংরক্ষিত নয়। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, মেধা ও সুযোগ এই চারটি বিষয়ই একজন মানুষের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।
প্রফেসর লং আজ মেলানোমা গবেষণার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা লাখো মানুষের চিকিৎসার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তিনি ২০২৪ সালের Australian of the Year হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন।
আর এখানেই বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে নারীর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা কি সক্ষমতার অভাব?
বাংলাদেশে নারীরা আজ প্রধানমন্ত্রী থেকে বিচারক, চিকিৎসক, পাইলট, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবু কিছু পেশাকে এখনো সামাজিকভাবে ‘পুরুষের কাজ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।
সম্প্রতি নারী চালকদের অংশগ্রহণে বিশেষ বাসসেবা চালুর উদ্যোগকে ঘিরে যে ধরনের বিদ্রূপ, আপত্তি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা আমাদের মানসিকতার একটি বড় দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। একজন নারী বাস চালাতে পারবেন কি না এই প্রশ্নটি আসলে প্রযুক্তিগত বা পেশাগত দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সমাজের লিঙ্গভিত্তিক ধারণার প্রশ্ন।
একজন নারী যদি বিমান চালাতে পারেন, জটিল অস্ত্রোপচার করতে পারেন, যুদ্ধবিমান পরিচালনা করতে পারেন কিংবা কোটি মানুষের জীবন রক্ষার গবেষণার নেতৃত্ব দিতে পারেন, তাহলে বাস চালানো নিয়ে সংশয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?
সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় নারীর ব্যর্থতার আশঙ্কা করি তার প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে নয়, বরং শুধুমাত্র তিনি নারী বলেই।
এই মানসিকতা শুধু বৈষম্য তৈরি করে না; এটি সম্ভাবনাকেও হত্যা করে।
প্রতিভা হারানোর অদৃশ্য কারখানা
একজন নারী যখন কোনো নতুন বা অপ্রচলিত পেশায় যেতে চান, তখন তাঁকে শুধু চাকরির যোগ্যতা অর্জন করলেই হয় না। তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়
- পারিবারিক আপত্তি,
- সামাজিক বিদ্রূপ,
- নিরাপত্তাহীনতা,
- কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য,
- যৌন হয়রানির আশঙ্কা,
- এবং ব্যর্থ হলে ‘দেখেছো, মেয়েদের দিয়ে হয় না’—এই নির্মম সামাজিক রায়ের।
ফলে অনেক প্রতিভাবান নারী শুরু করার আগেই থেমে যান।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশে মেধাবীদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। কিন্তু আরও বড় বিষয় হলো আমরা কি আমাদের সব মেধাকে সুযোগ দিচ্ছি?
একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি সামাজিক বাধার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে না পারে, তাহলে সেই দেশ অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা উদ্ভাবনে কখনোই তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।
ক্যান্সার গবেষণা থেকে বাংলাদেশের শেখার জায়গা
জর্জিয়া লংয়ের নেতৃত্বে এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য শুধু নারীর ক্ষমতায়নের উদাহরণ নয়; এটি গবেষণা, স্বাস্থ্যনীতি ও বিজ্ঞান বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় শিক্ষা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গবেষণাকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজ হিসেবে দেখে না। তারা গবেষণাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক গবেষণাগার এবং দক্ষ গবেষকদের স্বাধীনতা এসবের সমন্বয়েই এমন বৈজ্ঞানিক সাফল্য সম্ভব হয়।
বাংলাদেশেও ক্যান্সার গবেষণা, জিনোমিক মেডিসিন, বায়োটেকনোলজি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। mRNA প্রযুক্তি ভবিষ্যতে শুধু মেলানোমা নয়, ফুসফুস, মূত্রথলি, কিডনি ও অন্যান্য ক্যান্সার নিয়েও গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিভিন্ন ধরনের টিউমারে এই প্রযুক্তি নিয়ে একাধিক Phase II ও Phase III গবেষণা চলছে।
তবে প্রযুক্তি আমদানি করলেই হবে না; প্রয়োজন নিজস্ব গবেষক তৈরি করা। আর সেই গবেষক নারী না পুরুষ এই প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে হবে।
নারীকে ‘সুযোগ’ নয়, সমান মাঠ দিন
নারীর ক্ষমতায়ন মানে নারীদের প্রতি করুণা দেখানো নয়। নারীর ক্ষমতায়ন মানে সমান প্রতিযোগিতার মাঠ তৈরি করা।
একজন নারী বাসচালক হতে চাইলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একজন নারী বিজ্ঞানী হতে চাইলে তাঁকে গবেষণার সুযোগ দিতে হবে। একজন নারী উদ্যোক্তা হতে চাইলে তাঁর অর্থায়নের পথ সহজ করতে হবে। তারপর তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে তাঁর কাজ।
জর্জিয়া লংয়ের সাফল্য আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় মানবসভ্যতার অনেক বড় অর্জনের পেছনে এমন মানুষ রয়েছেন, যাঁরা হয়তো অন্য কোনো সমাজে জন্মালে সামাজিক বাধার কারণে তাঁদের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগই পেতেন না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু নারীকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসা নয়; বরং তাঁকে এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তিনি ভয় ছাড়াই নিজের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দেখাতে পারবেন।
একজন নারী বাস চালাবেন, বিমান চালাবেন, গবেষণাগার পরিচালনা করবেন কিংবা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দেবেন এগুলোকে বিস্ময় হিসেবে দেখার দিন শেষ হওয়া উচিত।
কারণ প্রশ্নটি নারী কী করতে পারেন, তা নয়।
প্রশ্নটি হলো আমরা তাঁকে কত দূর যেতে দিচ্ছি?

