শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলারের রেকর্ড অর্থ পরিশোধের চুক্তিতে সম্মত হয়েছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনি পদক্ষেপের পর করা এই আপসকে মেটার জন্য বড় ধরনের নতিস্বীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: সিএনবিসি
তবে বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ এবং নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে সম্মত হলেও মেটার আইনি ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের করা একাধিক মামলা এখনো চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের যৌথ উদ্যোগে বুধবার এই আপসের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রব বোন্টা বলেন, এই আপসকে মামলা বা আইনি পদক্ষেপের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি কেবল একটি সূচনা বা ন্যূনতম সীমা।
মেটার মতো প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের প্রতিষ্ঠানের জন্য আপসের অঙ্কটি বড় হলেও বাজার বিশ্লেষকদের অনেকে এটিকে কোম্পানিটির জন্য তুলনামূলক স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন। মামলার প্রাথমিক শুনানির সময় মেটার আইনজীবীরা আশঙ্কা করেছিলেন, সম্মিলিত বিচারে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য দাবির কথা জানিয়েছিলেন।
আদালতে যুক্তিতর্ক শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ঐতিহাসিক এই আপস চূড়ান্ত হয়। শুনানিতে মেটার শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে কেবল ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি সাক্ষ্য দেন। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গেরও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আপস চূড়ান্ত হওয়ায় তাকে আর আদালতে সাক্ষ্য দিতে হয়নি।
তবে আপসের অঙ্ক নিয়ে সন্তুষ্ট নন ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেয়ার। তিনি চুক্তিটিকে মেটার জন্য ‘নিশ্চিত জয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মেটার মতো বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েক সপ্তাহের রাজস্বের সমান অর্থ পরিশোধ কোনোভাবেই যথেষ্ট শাস্তি নয়। শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে ফ্লোরিডা আদালতে লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানান।
ফ্লোরিডার পাশাপাশি টেক্সাসও যৌথ আপসে অংশ নেয়নি। এই অঙ্গরাজ্য মেটার সঙ্গে আলাদাভাবে ১০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে।
অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালত অনুমোদিত আদেশে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অভ্যন্তরীণ পরিচালনায়ও বেশ কিছু পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কিশোরদের দৈনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে মেটাকে। রাতের বেলা ব্যবহার সীমিত করার জন্য চালু করতে হবে ‘নাইটটাইম ব্লক’ সুবিধাও।
শিশুদের বয়স যাচাইয়ের জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে।
মেটা জানিয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ১০ বছরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যকে ১ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে তারা। বাকি ৫৩০ কোটি ডলার গুগলের ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা ও বয়স যাচাইয়ের মতো একই ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ মেনে নেওয়ার বিষয়ে মেটা সম্মত হয়েছে। তবে আদালতের আদেশ কিংবা এই আপস নিয়ে গুগল ও টিকটক কোনো মন্তব্য করেনি।
আইনি লড়াই এখনো বাকি
মেটার সঙ্গে অঙ্গরাজ্যগুলোর এই আপস হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষতির অভিযোগে করা সম্মিলিত মামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে নিয়ে গঠিত পৃথক একটি ফেডারেল মামলাও এখনো বিচারাধীন।
এসব মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মেটা ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাদের আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে।
‘মাল্টিডিস্ট্রিক্ট লিটিগেশন’ বা এমডিএলের আওতাভুক্ত স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোর আইনজীবীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, হাজার হাজার তরুণ ও সরকারি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এখনো মেটার পাশাপাশি টিকটক, স্ন্যাপ ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক বাদী বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেও জানিয়েছেন।
বুধবার ‘টিডি কাওয়েন’-এর বিশ্লেষকেরা বলেন, এই আপসের ফলে মেটার শেয়ারবাজারে থাকা আইনি অনিশ্চয়তার চাপ কিছুটা কমেছে। তবে স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ও ব্যক্তিদের করা মামলাগুলো বহাল থাকায় কোম্পানিটির সামনে এখনো বড় অঙ্কের দায়ের ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
এ বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে ব্যক্তিগত ক্ষতির অভিযোগে করা একটি মামলায় ইউটিউবের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন ‘সিমনস হ্যানলি কনরে’ আইনি প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী জেন কনরে। মেটার এই আপসকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর প্রভাব শুধু মেটার ওপর নয়, পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পের ওপর পড়তে পারে।
তাঁর মতে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতি ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে মেটার সম্মত হওয়াটিই এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। মেটা এসব পরিবর্তনের পথ তৈরি করায় অন্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার না করলেও বিপুল অর্থ ব্যয় করে নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে। জেন কনরের মতে, এ ঘটনা দেখিয়েছে শিশুদের এমনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত করা উচিত হয়নি, যাতে তাদের শোষণ করা বা এসব অ্যাপের প্রতি আসক্ত করে তোলা সম্ভব হয়।
‘টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক রব লালকার মতে, এই আপসের ফলে মেটার প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর দিকগুলোর অন্তত কিছু অংশ থেকে শিশুরা সুরক্ষা পেতে পারে।
তবে তিনি মেটাকে স্বেচ্ছায় সঠিক কাজ করার জন্য প্রশংসা করার কোনো কারণ দেখেন না। তাঁর মতে, আদালতের মুখোমুখি হওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটিকে এসব পরিবর্তনে বাধ্য হতে হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টাও জানিয়েছেন, এই চুক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর সতর্কবার্তা। তাঁর বক্তব্য, মেটা যত বড় কোম্পানিই হোক না কেন, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
তিনি বলেন, টিকটকের বিরুদ্ধে চলমান মামলাসহ পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আইনসভার সঙ্গে কাজ করে এ খাতের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

