ডেটা সেন্টার আর পানি এখন প্রায় সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। প্রশ্ন একটাই, এত পানি দিয়ে আসলে কী করা হয়? অনেকের ধারণা, গাড়ির ইঞ্জিনের কুল্যান্টের মতো সারি সারি কম্পিউটারের ভেতর দিয়ে পানি বয়ে যায়। বাস্তবতা তা নয়। সার্ভার কখনো পানিতে ভেজে না। ডেটা সেন্টারের পানি মূলত পাইপের ভেতরেই থাকে, আর এর বড় অংশ বাষ্প হয়ে ছাদের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।
পানির প্রয়োজন কেন, তা বুঝতে হলে আগে বিদ্যুতের হিসাবটা দেখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মোট বিদ্যুতের ৪ শতাংশের বেশি এখন ডেটা সেন্টারগুলো খরচ করে। এই বিদ্যুতের প্রায় সবটাই শেষ পর্যন্ত তাপে রূপ নেয়। কম্পিউটার চিপ কোনো শক্তি জমিয়ে রাখে না, গতিতেও রূপান্তর করে না। সেকেন্ডে কোটি কোটি বার চালু-বন্ধ হওয়ার প্রতিটি ধাপে ভেতরের সিলিকন একটু একটু করে গরম হয়। সার্ভার যাতে গরমে অচল না হয়ে পড়ে, তাই এই তাপ ভবনের বাইরে বের করতেই হয়।

কাজটি হয় দুই ধাপে। প্রথম ধাপে সার্ভার হলের ভেতরে বাতাস বা তরলের মাধ্যমে চিপের তাপ শুষে নেওয়া হয়। এটি একটি বদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে একই পানি বা বাতাস বারবার ঘুরতে থাকে এবং কিছুই নষ্ট হয় না। পানির হিসাব শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপে। ভবনের ভেতরের তাপ বাইরে ফেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় কুলিং টাওয়ার, যা কাজ করে পানি বাষ্পীভূত করার মাধ্যমে।
গরমের দিনে দৌড়ঝাঁপ করলে শরীর ঘেমে যায়। এই ঘাম শরীর ভেজানোর জন্য নয়, বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বাষ্প হওয়ার সময় ঘাম শরীর থেকে প্রচুর তাপ টেনে নেয়। কুলিং টাওয়ারেও ঠিক একই নীতি কাজ করে। পানি গরম করলে তার অণুগুলো শুধু একটু দ্রুত নড়াচড়া করে। কিন্তু বাষ্প হতে হলে অণুগুলোকে একে অপর থেকে আলাদা হয়ে বাতাসে মিশে যেতে হয়, যার জন্য প্রচুর শক্তি লাগে। তাপমাত্রা না বাড়িয়ে তরলকে গ্যাসে পরিণত করার এই শক্তিকে বিজ্ঞানের ভাষায় লীন তাপ বলে।
হিসাবটি বেশ চমকপ্রদ। এক কেজি পানির তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়াতে লাগে প্রায় ৪২ কিলোজুল শক্তি। অথচ একই পরিমাণ পানিকে আরামদায়ক তাপমাত্রায়, অর্থাৎ প্রায় ৩০ ডিগ্রিতে বাষ্প করতে লাগে প্রায় ২ হাজার ৪৩০ কিলোজুল। অর্থাৎ পানি গরম করার চেয়ে বাষ্প করলে প্রায় ৫৮ গুণ বেশি তাপ শুষে নেওয়া যায়। এ কারণেই কুলিং টাওয়ার গরম পানি নদীতে ফেলে না দিয়ে বাষ্প করে আকাশে উড়িয়ে দেয়। ডেটা সেন্টারে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের পুরোটাই তাপ হয়ে যায়। সেই তাপ বের করতে কুলিং টাওয়ারে প্রায় দেড় লিটার পানি বাষ্প করতে হয়। শুধু পানি গরম করে তাপ বের করতে গেলে খরচ হতো প্রায় ৬০ গুণ বেশি।
ডেটা সেন্টারের কুলিং টাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশাল চিমনির মতো নয়। এগুলো সাধারণত চারকোনা বাক্সের মতো, ওপরে বড় বড় ফ্যান লাগানো থাকে এবং ভবনের ছাদে বা পাশের খোলা জায়গায় বসানো হয়। ভেতরের কাজটি বেশ মজার। সার্ভার থেকে আসা গরম পানি প্লাস্টিকের মৌচাকের মতো একটি কাঠামোর ওপর স্প্রে করা হয়। একই সময়ে ফ্যানগুলো বাইরের বাতাস টেনে সেই পানির ওপর দিয়ে বইয়ে দেয়। এতে সামান্য পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায়, আর বাকি পানি ঠান্ডা হয়ে আবার সার্ভারের তাপ আনতে ফিরে যায়। বাষ্প ছাদের ওপর দিয়ে ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে যায়।
এই টাওয়ার তিনভাবে পানি হারায়: বাষ্পীভবন, ব্লোডাউন ও ড্রিফট। ফ্যানের বাতাসে উড়ে যাওয়া পানির সামান্য ছিটেফোঁটা হলো ড্রিফট। আসল খরচ হয় বাষ্পীভবনে, যার জন্যই টাওয়ারটি বানানো। ব্লোডাউন কিছুটা লুকোনো। পানি বাষ্প হয়ে গেলে তার ভেতরের খনিজ পদার্থ টাওয়ারেই থেকে যায়, অনেকক্ষণ ফোটানোর পর হাঁড়ির তলায় লবণ জমার মতো। এগুলো জমতে দিলে পাইপ জ্যাম হয়ে যাবে। তাই টাওয়ার মাঝেমধ্যে এই লবণাক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন পরিষ্কার পানি টেনে নেয়।
এখান থেকেই আসে পানির হিসাবের দুটি আলাদা শব্দ, যা অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। ডেটা সেন্টার যে পরিমাণ পানি টেনে নেয়, সেটি উইথড্রয়াল। আর তার যে অংশ বাষ্প হয়ে যায়, সেটি কনজাম্পশন। ভালো মানের পানি হলে টেনে নেওয়া পানির প্রায় ৮০ শতাংশ বাষ্প হয়, বাকিটা ব্লোডাউন হিসেবে ড্রেনে চলে যায়।
বাস্তব চিত্র জায়গাভেদে ভিন্ন। কিছু বড় ক্লাউড কোম্পানির প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় মাত্র ১ লিটার পানি লাগে, কারণ বছরের বড় একটি সময় তারা বাইরের ঠান্ডা বাতাস ব্যবহার করে। আবার অ্যারিজোনার মতো মরুভূমি অঞ্চলে গরমের দিনে এই পরিমাণ ৯ লিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গরম ও শুষ্ক বাতাসের কারণে সেখানে টাওয়ারকে অনেক বেশি খাটতে হয়।
তাহলে শুধু বাইরের বাতাস দিয়ে ঠান্ডা করলে কী হয়? আবহাওয়া ভালো থাকলে অনেক ডেটা সেন্টার ঠিক তা-ই করে। কিন্তু এখানে একটি প্রাকৃতিক সীমা আছে, যার নাম ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা। থার্মোমিটারের নিচের অংশ ভেজা কাপড়ে মুড়ে বাতাস দিলে রিডিং কমতে থাকে, কারণ ভেজা কাপড় শুকানোর সময় তাপ টেনে নেয়। একটি পর্যায়ে গিয়ে তাপমাত্রা আর কমে না। বাষ্পীভবনের মাধ্যমে কোনো কিছু সর্বোচ্চ কতটা ঠান্ডা করা যায়, এটিই তার সীমা। শুকনো দিনে এই তাপমাত্রা সাধারণ বাতাসের তাপমাত্রার চেয়ে অনেক কম থাকে। কিন্তু বাতাস আগে থেকেই আর্দ্র থাকলে বাষ্পীভবন কার্যকর হয় না। কুলিং টাওয়ার পানিকে এই ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা পর্যন্ত নামাতে পারে। পানি ছাড়া শুধু রেডিয়েটর ও ফ্যান দিয়ে বড়জোর বাইরের বাতাসের তাপমাত্রা পর্যন্ত ঠান্ডা করা সম্ভব। তাই বাতাসনির্ভর ডেটা সেন্টারগুলোও বাইরের তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে পানি বাষ্প করার ব্যবস্থা চালু করে দেয়।
এসির মতো যান্ত্রিক পদ্ধতিতেও ঠান্ডা করা যায়। এটি যেকোনো আবহাওয়ায় কাজ করে এবং সরাসরি পানি খরচ করে না। কিন্তু এতে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে, আর সেই বিদ্যুৎ তৈরি করতে গিয়েই আবার পানি খরচ হয়।
ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহার মাপা হয় ‘ওয়াটার ইউসেজ ইফেক্টিভনেস’ দিয়ে, অর্থাৎ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য কত লিটার পানি বাষ্প হচ্ছে। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে ডেটা সেন্টারগুলো প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় গড়ে এক লিটারের তিন ভাগের এক ভাগের সামান্য বেশি পানি খরচ করে। ২০২৩ সালে দেশটির ডেটা সেন্টারগুলো মোট ৬ হাজার ৬০০ কোটি লিটার, অর্থাৎ ৬৬ বিলিয়ন লিটার পানি বাষ্প করেছে, যা দশ বছর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খরচও দ্রুত বাড়ছে।
তবে আসল বিতর্কের জায়গা এখানেই। ডেটা সেন্টারে সরাসরি যে পানি বাষ্প হয়, তা মোট খরচের খুব ছোট একটি অংশ। বিদ্যুৎ তো কোথাও না কোথাও থেকে আসতে হয়, আর বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রই বিশাল আকৃতির পানির কেটলির মতো। এগুলো পানি ফুটিয়ে বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরায় এবং সেই বাষ্প ঠান্ডা করতে নিজস্ব কুলিং টাওয়ারে আরও পানি খরচ করে। এই পরোক্ষ খরচ যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে মোট পানির ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ৮০০ বিলিয়ন লিটার। অর্থাৎ ডেটা সেন্টার নিজে যা খরচ করে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তার প্রায় ১২ গুণ পানি বাষ্প করে আকাশে উড়িয়ে দেয়।
চ্যাটবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পানি নষ্ট করে কি না, তার উত্তরও এই হিসাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। পুরোনো মডেল জিপিটি-৩-এর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ থেকে ৫০টি মাঝারি আকারের উত্তরের জন্য এটি আধা লিটারের একটি বোতলের সমান পানি খরচ করে। চমকপ্রদ বিষয় হলো এর বিভাজন। এই আধা লিটারের মধ্যে ডেটা সেন্টারে খরচ হয় মাত্র ২ মিলিলিটারের মতো, আর বাকি প্রায় ১৫ মিলিলিটার বাষ্প হয় ওই ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ জোগানো কেন্দ্রে।
তাহলে কি পানি ছাড়াই ডেটা সেন্টার চালানো সম্ভব? ডেটা সেন্টার এত পানি ব্যবহার করে কারণ সেখানে প্রচুর তাপ তৈরি হয়, আর পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে এই তাপ সরানোর সবচেয়ে সস্তা উপায় পানির বাষ্পীভবন। যে পদ্ধতিতে পানির খরচ সবচেয়ে বেশি, সেই পদ্ধতিতেই বিদ্যুৎ ও যন্ত্রপাতির খরচ সবচেয়ে কম। প্রকৌশলীরা পানির অপচয় করতে ভালোবাসেন বলে এটি বেছে নেননি। অন্য বিকল্পগুলোর বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি বলেই তাঁরা পানিকে বেছে নিয়েছেন।
এ প্রবণতা আংশিক বদলানো সম্ভব, কিন্তু এক দিক হালকা করলে অন্য দিক ভারী হবেই। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, তাদের নতুন নকশার ডেটা সেন্টারগুলো ঠান্ডা করতে কোনো পানি ব্যবহার করবে না। ২০২৭ সালের দিকে তারা সার্ভার চিপ সরাসরি বদ্ধ সার্কিটে তরল দিয়ে ঠান্ডা করার পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই স্বীকার করেছে, এতে তাদের বিদ্যুৎ খরচ বাড়বে। ড্রাই কুলার যেকোনো আবহাওয়ায় কাজ করলেও সেখানেও একই বিদ্যুতের মাশুল গুনতে হয়। চিপের ভেতরে তরল দিয়ে ঠান্ডা করাও চূড়ান্ত সমাধান নয়, কারণ সেই তাপ শেষ পর্যন্ত টাওয়ার বা রেডিয়েটরের মাধ্যমেই ভবনের বাইরে বের করতে হয়।
বিকল্প পথও আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কুলিং টাওয়ারে খাবার পানির বদলে পরিশোধিত পয়ঃবর্জ্যের পানি, কারখানার ব্যবহৃত পানি বা সমুদ্রের পানি ব্যবহার করে। কেউ কেউ প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা কোনো অঞ্চলে ডেটা সেন্টার বানায়। কেউ আবার বর্জ্য তাপ পাইপের মাধ্যমে আশপাশের বাড়িঘর গরম রাখার কাজে লাগায়।
যে পথেই হাঁটা হোক, খরচ কোনো না কোনোভাবে মেটাতেই হয়। হয়তো সরাসরি পানি দিয়ে, নয়তো বাড়তি বিদ্যুৎ এবং সেই বিদ্যুতের পেছনে থাকা পানি দিয়ে, কিংবা ঠান্ডা দেশে দীর্ঘ ক্যাবল টেনে ডেটা পাঠানোর খরচ জুগিয়ে। ফিনল্যান্ডের মতো শীতল দেশের জন্য ডেটা সেন্টারের যে সমাধান সঠিক, অ্যারিজোনার মরু অঞ্চলের জন্য তা একেবারেই বেমানান। তাই এই বিতর্কে শুধু পানির অঙ্ক নয়, বিদ্যুৎ, জলবায়ু ও স্থানীয় সম্পদের সামগ্রিক হিসাব মিলিয়ে দেখাই সবচেয়ে জরুরি।

