নাসা ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর তৈরি ও স্থাপন করা হবে। এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী একটি লক্ষ্য, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সাধ্যও হতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মহাকাশ অনুসন্ধানে এক বিপ্লব ঘটবে।
নাসার এই পদক্ষেপ এসেছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর শন ডাফির নতুন নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে। ডাফি বলেন, এটি একটি নতুন চাঁদে দৌড়ের অংশ, যেখানে আমেরিকা পিছিয়ে থাকতে চায় না। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে চীন ও রাশিয়া কমপক্ষে তিনবার যৌথভাবে ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চাঁদে রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। যেই দেশ প্রথম চাঁদে এই রিঅ্যাক্টর বসাবে, সে জায়গাটিতে ‘কিপ-আউট জোন’ ঘোষণা করতে পারবে, যা অন্যদের ওই অঞ্চলে প্রবেশে বাধা দেবে এবং নাসার আর্টেমিস মিশনকে প্রভাবিত করতে পারে।
১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই রিঅ্যাক্টর তৈরি এবং চাঁদে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে পাঁচ বছরের মধ্যে, যেখানে বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কাজ হবে। উল্লেখযোগ্য যে, এই শক্তি মাত্রা দিয়ে প্রায় ৮০টি আমেরিকান পরিবারের বিদ্যুৎ চালানো সম্ভব। এটি মার্স রোভার বা স্পেস প্রোবের ব্যবহার করা ছোট ক্ষমতার রিঅ্যাক্টরের চেয়ে অনেক বেশি। ছোটগুলোর ক্ষমতা মাত্র কয়েক শত ওয়াট, যা একপ্রকার টোস্টার বা লাইট বাল্বের সমান।
এই রিঅ্যাক্টরের ফলে কেবল চাঁদ নয়, পুরো সৌরজগতের মহাকাশ গবেষণার জন্য নতুন দ্বার উন্মুক্ত হবে, বলছেন নাসার সাবেক উপ-প্রশাসক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ভব্য লাল। তিনি বলেন, “এই শক্তির উপস্থিতিতে আমরা মহাকাশযানগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করতে পারব যা আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করবে, ছোট ছোট শক্তির জন্য নয়। একে বলা যায় মোমবাতি থেকে গ্রিড ইলেকট্রিসিটির যুগে যাত্রার মতো।”
২০৩০ সালের মধ্যে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র তৈরি করা সহজ হবে না, তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইউনিভার্সিটি অফ নিউ মেক্সিকোর পারমাণবিক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ মোহামেদ এল-জেনক বলেন, “আমাদের যখন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে, তখন আমরা অনেক দ্রুত এগিয়ে যাই। গত ৪০ বছরে এমন কেউ ছিল না।”
গত ৬০ বছরে পারমাণবিক মহাকাশ প্রযুক্তিতে অনেক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের অভাব ছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। নাসার আর্টেমিস মিশন মানবদের চাঁদে নিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক ধাপ তৈরি করবে, কিন্তু রাতের জন্য শক্তির নিশ্চয়তা প্রয়োজন। চাঁদের দিন রাতে প্রায় ১৪ দিন, তাপমাত্রার বড় ওঠানামা সহকারে, যা যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনও একই এলাকার জন্য পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনা করছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে জোট গড়ার চেষ্টা করছে। এই কারণে নাসা, ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট এবং এনার্জি ডিপার্টমেন্ট একসঙ্গে দ্রুত কাজ করতে শুরু করেছে।
নাসার পরিকল্পনায় একটি হেভি ল্যান্ডার দিয়ে ১৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত উপকরণ চাঁদে পৌঁছে দেওয়া হবে। রিঅ্যাক্টরটি চাঁদের কোনো গর্ত বা ভূগর্ভস্থ স্থানে রাখা হতে পারে যাতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দূষণ কম হয়। তবে চাঁদের পরিবেশ অনেক চ্যালেঞ্জের, যেমন সেখানে বাতাস না থাকার কারণে তাপ নির্গমন কঠিন, এবং ধূলিকণা যন্ত্রাংশে ক্ষতি করতে পারে।
পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সব সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়, বিশেষত মহাকাশযান উৎক্ষেপণ এবং অবতরণের সময়। রিঅ্যাক্টরের ইউরেনিয়াম জ্বালানি অনেক শক্তিশালী সুরক্ষা দিয়ে মোড়া থাকবে যাতে কোনো দুর্ঘটনায় সমস্যা না হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাজটি খুব কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মকানুনের অধীনে হবে।
এছাড়া, মহাকাশ আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তির দিক থেকেও নতুন ধারা তৈরি হবে। প্রথমে যে দেশ রিঅ্যাক্টর বসাবে, তারা নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত কারণে কিছু ‘কিপ-আউট জোন’ তৈরি করতে পারবে, কিন্তু তারা চাঁদের কোনো অংশের মালিকানা দাবি করবে না। এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তির আওতায় শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
পারমাণবিক শক্তির এই যুগান্তকারী প্রয়োগ হলে চাঁদ ও মার্সে স্থায়ী বসতি, খনিজ আহরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। নাসার বিশেষজ্ঞ ভব্য লাল বলেন, “আমরা তখন শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, ভালোমতো বাস করার জন্য ব্যবস্থা করতে পারব। বড় বড় যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কোনও অসুবিধা হবে না। এই প্রযুক্তি সৌরজগত উন্মোচনের ভিত্তি।”
নতুন মহাকাশ দৌড়ে এখন আর প্রথমবার চাঁদে পৌঁছানোর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কারা সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান করতে পারবে। যাদের সক্ষমতা থাকবে, তারাই মহাকাশের ভবিষ্যত গড়বে।

