সিএনএনের বিশ্লেষণ—
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ ও অপ্রত্যাশিত নেতৃত্বের কৌশল প্রয়োগ করছেন, যা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। তেহরানের পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকেও মতবিরোধ বাড়ছে, বিশেষ করে শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্টের পদত্যাগের পর। ট্রাম্পের অস্পষ্ট যুদ্ধ কৌশল, বিরোধপূর্ণ বক্তব্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাব নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে, যদিও তার সমর্থকরা এখনো তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার ওপর আস্থা রাখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে এখন এমন অপ্রত্যাশিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ধরন অনুসরণ করছেন, যা তিনি তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলার জন্য করেছিলেন। ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান স্ট্যাবলিশমেন্টের মতো বিষয়গুলো ভেঙে দেন, তখন তার সমর্থকরা সেটি পছন্দ করেন। তিনি সাধারণত চূড়ান্ত অবস্থান নেওয়া এড়িয়ে চলেন, যাতে ভবিষ্যতে কৌশলগতভাবে অবস্থান নেওয়া যায়। যদিও তার বক্তব্যে প্রায়ই বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অভাব থাকে, তার ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তার একটি ভাব তৈরি করে।
ট্রাম্পের এ দ্রুত ও দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা জানুয়ারিতে একটি সাহসী মার্কিন অভিযানে সাফল্য এনে দেয়, যেখানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার বাসভবন থেকে তুলে এনে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে নেওয়া হয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ নিয়ে তার অনেক বক্তব্যে এখনো একটি ঐতিহ্যগত যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্টের মতো গুরুত্ব ও স্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমানে ট্রাম্প এ যুদ্ধে একাধিক জটিল সংকটের মুখোমুখি। তেহরানের তীব্র প্রতিরোধ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে, ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের দাম বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে—মঙ্গলবার এক শীর্ষ মাগা (আমেরিকাকে আবার মহান করুন) ঘরানার জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার পদত্যাগ তারই ইঙ্গিত।
ট্রাম্প তেহরানের পাল্টা আক্রমণের তীব্রতায় বিস্মিত হয়েছেন। একইভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি অনেক বিশ্লেষক আগেই সতর্ক করলেও সে বিষয়ে ট্রাম্পের প্রস্তুতি ছিল না বলে মনে হয়।
এছাড়া, মিত্রদের জোর করে এ প্রণালিতে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, তারা এ যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। ট্রাম্প এখন আশা করছেন, তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা শেষ পর্যন্ত কাজে দেবে।
যখন কোনো যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে পারেন না, তখন কৌশলগত বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং জনগণের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। তবে এখনো এ যুদ্ধের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ভবিষ্যতে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত—বিশেষ করে শীর্ষ নেতা আলি লারিজানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর।
তবে এমনটাও হতে পারে যে, ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত বুদ্ধিদীপ্ত ছিল এবং তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এমন ফল দিয়েছে, যা অন্য প্রেসিডেন্টরা পারেননি। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলে যদি হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধই থাকে, বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয় এবং ইরানে আরও কঠোর দমননীতি জারি থাকে—তাহলে ট্রাম্পের পক্ষে এটিকে সাফল্য বলা কঠিন হবে।
একইভাবে, যদি ইরান উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধরে রাখতে পারে, সেটিও বড় উদ্বেগের বিষয় হবে। এ জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে আরও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপ—সম্ভবত স্থলবাহিনী ব্যবহার প্রয়োজন হতে পারে। আর এমন পদক্ষেপ সফল করতে হলে দরকার সুপরিকল্পিত কৌশল, স্পষ্ট লক্ষ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি দক্ষভাবে সামাল দেওয়া।
ট্রাম্পের প্রচার শিবিরে দ্বন্দ্ব: মঙ্গলবার জো কেন্টের পদত্যাগ ওয়াশিংটনে বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। এতে এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প তার নিজের রাজনৈতিক শিবিরের ওপরও নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে বলেন, তিনি মনে করেন ইসরায়েলের ভুল তথ্যের কারণে ট্রাম্প বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং দ্রুত বিজয়ের ধারণা পোষণ করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ছিল না—যা ট্রাম্প ও তার প্রশাসন দাবি করেছিল।
কেন্ট লিখেছেন, ‘আপনি চাইলে নতুন পথ বেছে নিতে পারেন, না হলে আমরা বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাব।’
কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা তার বক্তব্যকে ইহুদিবিরোধী বলে সমালোচনা করেছেন। তবে এ পদত্যাগ ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তার ডানপন্থি ঘরানার মধ্য থেকেই আসতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাম্প সাধারণত নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেন।
অস্পষ্ট বার্তা ও কৌশলগত দ্বিধা: ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো তার যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সময়সীমা এবং কৌশল নিয়ে আরও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কিছুদিন আগে মিত্রদের সাহায্য চাইলেও পরে তিনি বলেন, তিনি নাকি তাদের চাপে ফেলেননি এবং তাদের সাহায্য দরকারও নেই। যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এ যুদ্ধ কি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে কি না, তখন তিনি জবাব দেন—আমি ভয় পাই না… আমি কিছুতেই ভয় পাই না।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক পরিকল্পনা আছে।’ কিন্তু কোনো বিস্তারিত দেননি। তিনি কখনো বলেছেন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি, আবার কখনো শাসন পরিবর্তনের কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরে আবার সেটি কম গুরুত্ব দিয়েছেন।
একটি মন্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা তেলের জন্য এটা করিনি… বলা যেতে পারে অভ্যাসবশত করেছি’—যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে তার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েই।
তিনি আবার একদিকে দাবি করেন যুদ্ধে প্রায় জিতে গেছেন, অন্যদিকে বলেন, ‘এখনই সেনা সরানোর সময় নয়।’ ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘নিজের অনুভূতি’ থেকে বুঝতে পারবেন কখন যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে। তার এ আত্মবিশ্বাস অতীতে তাকে সফল করেছে, কিন্তু এ যুদ্ধের মতো জটিল পরিস্থিতিতে এটি বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

