মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনীতিতে আবারও বড় মোড়ের আভাস মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং সপ্তাহান্তেই ইউরোপের কোথাও তা সই হতে পারে। কিন্তু তেহরান এখনো সতর্ক। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আলোচনা চলছে ঠিকই, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
এই দুই ধরনের বক্তব্যই বর্তমান পরিস্থিতির মূল বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে যুদ্ধ, অবরোধ, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারের চাপ দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন তৈরি করেছে। অন্যদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, লেবানন, ইসরায়েল এবং ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে এত গভীর মতবিরোধ আছে যে, একটি স্বাক্ষরই সব সমস্যার শেষ করবে—এমন ভাবা সহজ হলেও বাস্তবতা অনেক কঠিন।
সম্ভাব্য এই সমঝোতা তাই চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির চেয়ে বেশি একটি অন্তর্বর্তী কূটনৈতিক কাঠামো। এর লক্ষ্য হতে পারে যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং আরও কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করা।
ট্রাম্পের ঘোষণা কেন এত আলোচিত
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে আলোচনার বিষয় পৌঁছেছে এবং প্রধান দিকগুলো অনুমোদিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত হামলা স্থগিত করেছে, কারণ একটি সমঝোতা প্রায় প্রস্তুত।
ট্রাম্পের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, তিনি চুক্তির সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ইউরোপে হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, সময় ও স্থান শিগগির জানানো হবে। তিনি এমনও দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, মিসরসহ বিভিন্ন পক্ষ বিষয়টি জানে বা সমর্থন করছে।
কিন্তু ট্রাম্পের ঘোষণার বড় সমস্যা হলো—তেহরান একইভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। অতীতে তিনি একাধিকবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি খুব কাছাকাছি। কিন্তু বাস্তবে আলোচনা বারবার বাধার মুখে পড়েছে। তাই তাঁর নতুন ঘোষণাকে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ইরানের সতর্ক অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেছেন, চুক্তি নিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তার অনেকটাই অনুমাননির্ভর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
তেহরানের অবস্থান হলো, তারা চাপ বা হুমকির মুখে নিজেদের মৌলিক অবস্থান ছাড়বে না। ইরান বলছে, আলোচনার বড় অংশ এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজের অবস্থান বদলাচ্ছে। ফলে খসড়ার ভাষা, বাস্তবায়নের ধাপ এবং প্রতিশ্রুতির নিশ্চয়তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ইরানের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা শুধু পারমাণবিক প্রশ্নে আলোচনা করতে চায় না। তেহরান চায়, হরমুজ প্রণালি, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, জব্দ অর্থ এবং লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ও আলোচনার অংশ হোক। অর্থাৎ ইরান এই সমঝোতাকে শুধু নিরাপত্তা চুক্তি নয়, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবেও দেখতে চায়।
সম্ভাব্য চুক্তির মূল কাঠামো কী হতে পারে
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতার কয়েকটি প্রধান অংশ থাকতে পারে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি আবার স্বাভাবিক নৌচলাচলের জন্য খুলে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। তৃতীয়ত, ইরানের তেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা তুলে নেওয়ার আলোচনা। চতুর্থত, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের বিষয়। পঞ্চমত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার পথ তৈরি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে, ইরান আগে পারমাণবিক বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিক। বিশেষ করে ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে, কিনে না নেয় এবং সেই সক্ষমতা অর্জনের পথে না এগোয়—এটাই ওয়াশিংটনের প্রধান শর্ত।
অন্যদিকে ইরান চাইবে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক ছাড় দিক। তেহরানের দাবি, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তাদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই কোনো সমঝোতা কার্যকর হতে হলে তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জব্দ অর্থের প্রশ্নে দৃশ্যমান পরিবর্তন দরকার।
হরমুজ প্রণালি: আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার
হরমুজ প্রণালি এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শান্তিকালে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই হরমুজ বন্ধ থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই চাপের মুখে পড়ে।
ইরান হরমুজকে নিজের সবচেয়ে বড় দরকষাকষির শক্তি হিসেবে দেখছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচল কমে যায়, এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজ খুলে দেওয়া বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, সমঝোতা হলে হরমুজ খুলবে এবং তেলের দাম দ্রুত কমবে। কিন্তু ইরান সহজে এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চাইবে না। তেহরান মনে করে, হরমুজ তার ভৌগোলিক ও সামরিক প্রভাবের বাস্তব প্রতীক। তাই চুক্তির ভাষায় প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও, তার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় মতবিরোধ থাকতে পারে।
পারমাণবিক প্রশ্ন: সবচেয়ে কঠিন বাধা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের সবচেয়ে পুরোনো ও জটিল অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার—ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেওয়া যাবে না। শুধু অস্ত্র তৈরি নয়, এমন অস্ত্র কেনা বা সেই সক্ষমতা অর্জনের পথও বন্ধ করতে হবে বলে ওয়াশিংটন মনে করে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তাদের বক্তব্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বেসামরিক কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা তাদের অধিকার। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র আগের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান তার কর্মসূচি বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত আছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রার।
এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান মুখোমুখি। ওয়াশিংটন চাইবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন এবং সীমাবদ্ধতা। তেহরান চাইবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে সীমিত সমঝোতা, কিন্তু নিজের সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে। ফলে সম্ভাব্য প্রাথমিক চুক্তি হলেও পারমাণবিক প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকতে পারে।
ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাব কী ইঙ্গিত দেয়
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ১৪ দফার একটি খসড়া সমঝোতা প্রস্তাব দিয়েছে। এই খসড়া পরিবর্তনযোগ্য হলেও এতে ইরানের অগ্রাধিকারগুলো পরিষ্কার।
প্রথমত, ইরান সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে শত্রুতা বন্ধ চায়। এর মধ্যে লেবাননও আছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে, সেই নিশ্চয়তা চায়। তৃতীয়ত, ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি ব্যবস্থাপনায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের বিষয়ও আছে। ইরান চায়, এসব অর্থ তার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হোক। যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তেহরান আরও প্রস্তাব করেছে, পারমাণবিক ও অন্যান্য জটিল বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের আলোচনার সময় রাখা হোক। অর্থাৎ এখনই সবকিছু শেষ করার বদলে, প্রথমে উত্তেজনা কমিয়ে পরে বড় প্রশ্নগুলোর দিকে এগোনোর পথই তারা চাইছে।
লেবানন প্রশ্ন কেন চুক্তিকে কঠিন করছে
সম্ভাব্য সমঝোতার সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক অংশ হলো লেবানন। ইরান চায়, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি হোক। কারণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান সেটিকে নিজের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখবে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই অবস্থান সহজে মানবে না। ইসরায়েলের দাবি, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের থাকতে হবে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে তারা সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে যুদ্ধ থামাতে চাইছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। যদি সমঝোতায় লেবাননে হামলা বন্ধের শর্ত থাকে, তাহলে ইসরায়েল তা মেনে নেবে কি না—এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল চাইবে না লেবাননকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত করা হোক। কিন্তু ইরান চাইছে এই সংযোগ রাখতে। তাই লেবানন প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত চুক্তির বাস্তবায়নকে দুর্বল করে দিতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা ও জব্দ অর্থ: ইরানের অর্থনৈতিক দাবি
ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, তেল রপ্তানি, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই তেহরানের কাছে চুক্তির সাফল্য মাপার বড় মানদণ্ড হলো অর্থনৈতিক স্বস্তি।
ইরান চায়, তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। একই সঙ্গে বিদেশে জব্দ থাকা অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এই অর্থ ইরানের কাছে শুধু আর্থিক সম্পদ নয়; এটি তাদের জাতীয় অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য একসঙ্গে বড় ছাড় দিতে সতর্ক। ওয়াশিংটন চাইবে, ইরান আগে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আচরণ নিয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিক। তারপর ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এই ‘আগে কে ছাড় দেবে’ প্রশ্নই আলোচনার বড় বাধা।
ট্রাম্প কেন দ্রুত চুক্তি চাইছেন
ট্রাম্পের জন্য এই সমঝোতা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ে, জনমত ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রশাসনের ওপর দায় বাড়ে। তেলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে, যা যেকোনো সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়া ট্রাম্প নিজেকে শক্তিশালী দরকষাকষিকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হলে তিনি বলতে পারবেন, সামরিক চাপ ও কূটনীতির সমন্বয়ে তিনি ফল এনেছেন। বিশেষ করে হরমুজ খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের পথ বন্ধ করার দাবি তিনি বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। যদি চুক্তি ঘোষণা করার পর তা বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে তাঁর ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর যদি চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পায় বলে মনে হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনা বাড়তে পারে।
ইরান কেন সতর্ক ভাষা ব্যবহার করছে
ইরানের সতর্ক অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, তারা চায় না ট্রাম্পের ভাষায় সমঝোতার কাঠামো নির্ধারিত হোক। দ্বিতীয়ত, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তৃতীয়ত, তেহরান নিশ্চিত হতে চাইছে যে, অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো শুধু কাগজে থাকবে না; বাস্তবে কার্যকর হবে।
ইরান জানে, অতীতেও চুক্তি হয়েছে, আবার ভেঙেও গেছে। ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা তেহরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা এমন নিশ্চয়তা চাইতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন বা অবস্থান বদল চুক্তিকে সহজে অকার্যকর করতে না পারে।
চূড়ান্ত শান্তি কি সম্ভব
বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, খুব দ্রুত একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি হওয়া কঠিন। বরং একটি সমঝোতা স্মারক বা প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হতে পারে, যা যুদ্ধবিরতি ধরে রাখবে এবং পরবর্তী আলোচনার পথ খুলবে।
এই ধরনের ধাপভিত্তিক চুক্তির সুবিধা হলো, তা দ্রুত উত্তেজনা কমাতে পারে। হরমুজ খুলে গেলে জ্বালানি বাজার কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। নৌ অবরোধ কমলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে। দুই পক্ষ আবার নিয়মিত আলোচনায় ফিরতে পারে।
কিন্তু এর দুর্বলতা হলো, বড় সমস্যাগুলো পরে জমে থাকে। পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক মিত্র, লেবানন, ইসরায়েল, নিষেধাজ্ঞা—এসব বিষয়ে বিস্তারিত সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন। প্রাথমিক চুক্তি সফল হলেও পরের ধাপে মতবিরোধ বাড়লে আগের অর্জনও ভেঙে যেতে পারে।
সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব। দুই পক্ষই সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলার হুমকি দিয়ে ইরানকে টেবিলে রাখতে চাইছে। ইরান হরমুজ ও আঞ্চলিক প্রভাবকে দরকষাকষির শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো বাইরের পক্ষ। ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ, উপসাগরীয় রাষ্ট্র, পাকিস্তান, কাতার—প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থ আছে। একটি পক্ষ যদি মনে করে চুক্তি তার নিরাপত্তা বা প্রভাব কমিয়ে দিচ্ছে, তাহলে তারা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তৃতীয় ঝুঁকি হলো প্রত্যাশার ব্যবধান। ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যা চেয়েছিল তা পেয়েছে। ইরান বলছে, তারা নিজের অবস্থান ছাড়েনি। যদি একই চুক্তি দুই পক্ষ দুইভাবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে বাস্তবায়নের সময় বড় সংকট তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার খুব কাছাকাছি। কিন্তু কাছাকাছি থাকা আর চূড়ান্ত শান্তিতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। এখন যে আলোচনা চলছে, তা মূলত যুদ্ধের আগুন কমানো, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার দরজা খুলে রাখার চেষ্টা।
এই সমঝোতা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে, জ্বালানি বাজারে স্বস্তি আসতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নতুন আলোচনার পথে ফিরতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, লেবানন ও ইসরায়েল প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরের পথ।
তাই সপ্তাহান্তে কোনো চুক্তি সই হলেও সেটিকে শেষ গন্তব্য বলা যাবে না। বরং সেটি হবে দীর্ঘ, কঠিন এবং অনিশ্চিত কূটনৈতিক যাত্রার প্রথম বড় ধাপ। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন শুধু একটি স্বাক্ষরের ওপর নয়; সেই স্বাক্ষরের পর প্রতিটি পক্ষ কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করে, তার ওপর নির্ভর করবে।

