ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা দুই সপ্তাহের সামরিক উত্তেজনার পর আপাতত হামলা বন্ধ থাকার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমে আসার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একদিনেই প্রায় পাঁচ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন শুধু বাজারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদেরও প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৭ জুলাই) বাংলাদেশ সময় ভোরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৮৯ ডলার বা ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ কমে ৯১ দশমিক ৮৯ ডলারে নেমে আসে। দিনের শুরুতে একপর্যায়ে এই দাম ৯০ ডলারের নিচেও চলে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় দরপতন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত পশ্চিম টেক্সাস অপরিশোধিত তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৬৭ ডলার বা ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৬৪ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই মূলত দামকে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী করেছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে যায় এবং দাম দ্রুত কমতে শুরু করে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় শুধু হরমুজই নয়, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এশিয়ামুখী তেল সরবরাহও চাপের মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও সময় দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত সামরিক হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পথে এগোতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা কার্যকর হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দামে অতিরিক্ত অস্থিরতা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও আগের স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে প্রতিদিন ১০টিরও কম পণ্যবাহী জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করেছে।
এদিকে লোহিত সাগর উপকূলে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাও শিপিং কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের জাহাজ চলাচলে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তেলের দাম কমে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। তাই সামরিক উত্তেজনা আবারও বাড়লে তেলের বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান দরপতন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর আমদানি ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচে চাপ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

