বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ ধারণাটি চালুর পর পরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোর পর সেই প্রত্যাশা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
কাগজে-কলমে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ হিসেবে ছাড়পত্র পাওয়া অনেক ইয়ার্ডেই শ্রমিকদের এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে ৮৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ শ্রমিক এবং আহত হয়েছেন ৮১ জন। অর্থাৎ হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পরও দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা থামেনি। বরং দুর্ঘটনার ধরন ও হতাহতের সংখ্যা দেখে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘গ্রিন’ ঘোষণা করা ইয়ার্ডগুলো বাস্তবে কতটা নিরাপদ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩১টি সচল শিপইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে ছাড়পত্র পেয়েছে এবং আরও ৮টি রয়েছে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। অর্থাৎ সচল ইয়ার্ডগুলোর বড় অংশই ইতিমধ্যে পরিবেশ ও নিরাপত্তার উন্নত মানদণ্ড অনুসরণের স্বীকৃতি পেয়েছে।
কিন্তু দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে, সনদ পাওয়ার পরও অনেক ইয়ার্ডে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন ঘটনার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওপর থেকে ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন কিংবা তার ছিঁড়ে যাওয়া এবং গ্যাস বিস্ফোরণ—এসব কারণেই বড় অংশের দুর্ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ ঝুঁকিগুলো এমন নয়, যেগুলো আগে থেকে শনাক্ত করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব। বরং যথাযথ নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি থাকলে এসব ঝুঁকির অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ফেরদৌস স্টিলের সর্বশেষ দুর্ঘটনাটিও সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বাতিল জাহাজটির একটি আবদ্ধ ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জমে ছিল। সেখান থেকেই বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এলএনজি বহনকারী জাহাজটির নাম ছিল ‘এমটি রাসি’। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে এবং একই মাসে ভাঙার জন্য উপকূলে নেওয়া হয়। একটি আবদ্ধ স্থানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিই এখন নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ কম। বিলসের পরিসংখ্যানের বাইরে বেলার তথ্যেও দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে এই ইয়ার্ডে গত শুক্রবারের ঘটনার আগে আরও ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনায় অন্তত তিন শ্রমিক মারা যান। অর্থাৎ একই প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর দুর্ঘটনার নজির থাকার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এসেছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি।
শুধু ফেরদৌস স্টিল নয়, অন্যান্য ছাড়পত্র পাওয়া ইয়ার্ডের তথ্যও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। সীতাকুণ্ডের লালবাগের কেআর স্টিল ইয়ার্ডে ২৯টি দুর্ঘটনায় ২৯ শ্রমিক আহত হয়েছেন। আরেফিন এন্টারপ্রাইজে ৯টি দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু ও আটজন আহত হয়েছেন। ফেরদৌস স্টিলে চারটি দুর্ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু ও ১০ জন আহত হয়েছেন। জনতা স্টিলেও ঘটেছে ছয়টি দুর্ঘটনা। এসব তথ্য ‘গ্রিন’ সনদ দেওয়ার পর ইয়ার্ডগুলোর বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
পরিসংখ্যান আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে আনে। ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তরের পর আগের দুই বছরের তুলনায় জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে এই শিল্পে ৭ শ্রমিক নিহত এবং ২৮ জন আহত হন। ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ৭ এবং আহত ২২ জন। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যে নতুন কাঠামো চালু হলেও শ্রমিক হতাহতের ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
এই বাস্তবতার কারণেই ‘গ্রিন লাইসেন্স’ নিয়ে ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর অভিযোগ উঠছে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন না এনেও কাগজে-কলমে পরিবেশবান্ধব হওয়ার স্বীকৃতি পাচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরিবেশবান্ধব সনদ যদি শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিরাপদ না করে, তাহলে সেই সনদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

২০০৯ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ‘হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন’ গ্রহণ করে। গত বছরের ২৬ জুন থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। জাহাজ পুনর্ব্যবহারের সময় মানুষের স্বাস্থ্য, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোই এই বৈশ্বিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর সম্পর্কও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ সংগঠনগুলোর বক্তব্য হলো, শুধু হংকং কনভেনশন দিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পের সব ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) মনে করে, জাহাজভাঙার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বাসেল কনভেনশনের বিধানও কার্যকরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সংগঠনটির অভিযোগ, হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর কিছু ইয়ার্ড মালিক এমন যুক্তি দিচ্ছেন যে এখন বাসেল কনভেনশনের কঠোর নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও এই ব্যবধানকে স্পষ্ট করছে। সম্প্রতি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শনের সময় শ্রমিকেরা জানান, সেখানে নিয়মিত নিরাপত্তাবিধি উপেক্ষা করা হয়। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও জাহাজ কাটার কাজ চলার অভিযোগ রয়েছে। একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম পুরোনো হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা প্রয়োজন হলেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বছরে মাত্র এক সেট সরঞ্জাম দেয়। নিরাপত্তা সরঞ্জাম কতটা কার্যকর অবস্থায় আছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য তা পর্যাপ্ত কি না, সেটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি এবং মজুরি পরিশোধ না করার অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) ফেরদৌস স্টিলসহ ছাড়পত্র পাওয়া তিনটি ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ডিআইএফই চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মাহবুব হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জুলাই মাসে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এ ধরনের তিনটি মামলা করা হয়েছে।
মাহবুব হোসেনের ভাষ্য, পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শ্রম আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু ছাড়পত্র দেওয়াই যথেষ্ট নয়; ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে নিয়ম মেনে চলছে কি না, সেটি নিয়মিত যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফেরদৌস স্টিল কর্তৃপক্ষ অবশ্য অবহেলার অভিযোগ মানছে না। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী বলেছেন, তারা গ্রিন শিপইয়ার্ডের নিয়ম মেনেই কাজ করেন এবং যেসব কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দেয়, তারা সরাসরি বিষয়গুলো তদারকি করে। তার দাবি, কোনো গাফিলতি থাকলে ইয়ার্ডটির কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হতো না। তিনি ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে তদারকির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার স্বীকার করেছেন, অনেক ইয়ার্ড পুরোপুরি নিয়ম মানতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর সেখান থেকেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি জানিয়েছেন, ইয়ার্ডগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং অবহেলা পাওয়া গেলে কাজ বন্ধ করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শুক্রবারের প্রাণহানির পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ফেরদৌস স্টিলের সব কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে ‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ বা সুবিধাজনক দেশের পতাকা ব্যবহারের কারণে। ভাঙার জন্য বাংলাদেশে পাঠানোর ঠিক আগে ‘এমটি রাসি’ অন্য একটি দেশের পতাকা ব্যবহার শুরু করেছিল। সাধারণভাবে কঠোর আইন, নিয়ন্ত্রণ বা পরিবেশগত মানদণ্ড এড়ানোর উদ্দেশ্যে অন্য দেশে জাহাজ নিবন্ধন করার প্রবণতাকেই ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স বলা হয়।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ‘এমটি রাসি’র মালিক ছিল দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক এইচ-লাইন শিপিং কোম্পানি এবং জাহাজটি পরিচালনা করত কোরিয়া গ্যাস করপোরেশন। ২৬ বছর বয়সী জাহাজটি তার আয়ুষ্কালের বড় সময় দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকায় চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ভাঙার জন্য পাঠানোর আগে এটি সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের পতাকা গ্রহণ করে। এই পরিবর্তন নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠেছে—একটি জাহাজ যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অন্য দেশের পতাকা নেয়, তখন তার পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত দায়বদ্ধতা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে বাসেল কনভেনশনও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৪ সালে এই কনভেনশনে যুক্ত হয়। ফলে দেশটির জাহাজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক কঠোর আন্তর্জাতিক বিধান প্রযোজ্য। অন্যদিকে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস প্যারিস মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ‘কালো তালিকাভুক্ত’ দেশ। এই ব্যবস্থায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণের ভিত্তিতে দেশগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। কালো তালিকায় থাকা দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্যারিস এমওইউ মূলত ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের বন্দরগুলোয় জাহাজের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান তদারক করে।
বাংলাদেশের আদালতের আগের কয়েকটি সিদ্ধান্তও এখানে প্রাসঙ্গিক। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, ভাঙার জন্য বাংলাদেশে আমদানি করা সব জাহাজকে বাসেল কনভেনশনের নিয়ম মানতে হবে। পরে ধূসর বা কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের দাবিতে বেলা রিট করলে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট জানান, এসব দেশ থেকে জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আদালত সে সময় কালো বা ধূসর তালিকাভুক্ত দেশ থেকে পুরোনো জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন।
ফলে বর্তমান সংকটটি শুধু একটি ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এখানে একদিকে রয়েছে ইয়ার্ডকে ‘গ্রিন’ ঘোষণা করার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে রয়েছে সেই সনদের পরবর্তী তদারকি। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাহাজের উৎস, পতাকা পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধান এবং আদালতের নির্দেশনা। এসব স্তরের কোনো একটিতে দুর্বলতা থাকলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শ্রমিকদেরই।
শিপইয়ার্ডকে ‘গ্রিন’ ঘোষণা করার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাহলে শুধু ছাড়পত্র প্রদান দিয়ে সেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। ছাড়পত্র পাওয়ার পর নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান যাচাই, বিষাক্ত গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নিয়ম ভাঙলে দ্রুত ও কার্যকর শাস্তি—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ দুর্ঘটনাগুলো অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে, কাগজে একটি ইয়ার্ড ‘গ্রিন’ হয়ে গেলেই শ্রমিকের কর্মস্থল নিরাপদ হয়ে যায় না।
৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর এখন মূল প্রশ্ন তাই শুধু কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—যে ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ইয়ার্ডকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা?
যদি সনদ পাওয়ার পরও একই ইয়ার্ডে বারবার প্রাণহানি ঘটে, তাহলে সনদ দেওয়ার পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগ ও তদারকির দায়ও নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পের ‘সবুজ’ পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাই শেষ পর্যন্ত কাগজে নয়, শ্রমিকের নিরাপদ কর্মস্থলে।

