বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী মতপার্থক্য বিদ্যমান। সম্প্রতি এই বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই, বরং সবাই ‘বাংলাদেশি’ এমন রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি জনগোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা হবে এই বিতর্কের মধ্যেই কি আমরা তাদের বাস্তব অধিকার সংকটকে আড়াল করে ফেলছি?
মূলত এখানেই সমস্যার গভীরতা।
শব্দের বিতর্ক, নাকি অধিকারের প্রশ্ন?
রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও ‘আদিবাসী’ শব্দের স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রের একটি বড় উদ্বেগ হলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ভূমি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বিশেষ অধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দাবি, এটি শুধু একটি শব্দের প্রশ্ন নয়; এটি আত্মপরিচয় ও অধিকার স্বীকৃতির প্রশ্ন। তারা মনে করেন, নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার তাদের থাকা উচিত।
এই দুই অবস্থানের সংঘাত যতদিন শুধু পরিভাষার বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন মূল সমস্যা গুলো যেমন ভূমি হারানো, উচ্ছেদ, সাংস্কৃতিক সংকট, প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং বৈষম্য সমাধানের বাইরে থেকে যাবে।
ভূমিই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা
বাংলাদেশের পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোর একটি হলো ভূমি। উন্নয়ন প্রকল্প, বন ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, ইকোপার্ক কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভূমির প্রশ্ন প্রায়ই যুক্ত হয়ে যায়।
রাষ্ট্র উন্নয়ন করবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু উন্নয়নের নামে কোনো জনগোষ্ঠী যদি নিজের বসতভিটা, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সমস্যা হলো, অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নীতিতে উন্নয়নকে দেখা হয় অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিতে; কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সেই উন্নয়নের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
ফলে পাহাড় হয়ে ওঠে পর্যটনের জায়গা, বন হয়ে ওঠে প্রকল্পের সম্পদ কিন্তু সেখানে বসবাসকারী মানুষের অধিকার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়ে।
জাতীয় পরিচয় কি বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে?
‘বাংলাদেশি’ পরিচয় নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রীয় নাগরিক পরিচয়। কিন্তু নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে জাতিগত, ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংঘাত থাকার কথা নয়।
একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাংলাদেশি এবং চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল বা অন্য কোনো জাতিসত্তার সদস্য হতে পারেন। রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই।
বরং আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই একটি অভিন্ন নাগরিকত্বের কাঠামোর মধ্যে বহুমাত্রিক পরিচয়কে মর্যাদা দেওয়া।
জাতীয় ঐক্য তখনই দুর্বল হয়, যখন কোনো জনগোষ্ঠী মনে করে তাদের নিজস্ব পরিচয়কে রাষ্ট্র সন্দেহের চোখে দেখছে। পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
কোটা, প্রতিনিধিত্ব ও নতুন বৈষম্যের আশঙ্কা
শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে সমান সুযোগ দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া বৈষম্য নয়; বরং প্রকৃত সমতার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
কারণ কাগজে-কলমে সবাই সমান হলেও বাস্তব জীবনে সবার শুরু এক জায়গা থেকে নয়।
ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক দূরত্ব, দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক জনগোষ্ঠী এখনও মূলধারার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে। তাই তাদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে কেবল সংখ্যার হিসাব দিয়ে বিচার করলে বাস্তব বৈষম্যের চিত্রটি ধরা পড়ে না।
রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন আস্থার রাজনীতি
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থা। ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো যদি মনে করে রাষ্ট্র তাদের পরিচয়, ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষায় আন্তরিক নয়, তাহলে দূরত্ব বাড়বে। আবার রাষ্ট্র যদি মনে করে পরিচয়ের প্রশ্নই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাহলে সংলাপের পথ সংকুচিত হবে।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস ও নীতিগত স্পষ্টতা।
রাষ্ট্র চাইলে ‘আদিবাসী’ শব্দের আইনি অবস্থান নিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা রাখতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ভূমির নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক অধিকার, মাতৃভাষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ শব্দ নিয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকার নিয়ে আপস করার কোনো কারণ নেই।
পরিশেষে
বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বিতর্কের সমাধান শুধু অভিধানে শব্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর সমাধান খুঁজতে হবে মানুষের বাস্তব জীবনে।
প্রশ্ন হওয়া উচিত এই জনগোষ্ঠীগুলো কি নিরাপদে তাদের ভূমিতে বসবাস করতে পারছে? তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি কি টিকে আছে? উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে কি না? রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের প্রতিনিধিত্ব কতটুকু? একজন নাগরিক হিসেবে তারা কি সমান মর্যাদা পাচ্ছে?
পরিচয়ের নাম নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে কোনো মানুষের অধিকার হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে ঐক্য মানে সবাইকে একরকম বানানো নয়; বরং ভিন্নতাকে মর্যাদা দিয়েও একই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক হিসেবে পাশে দাঁড়ানো।
মূল আলোচনায় স্বাধীনতার পর থেকে পরিচয়-সংকট, ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থানের ধারাবাহিকতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

