বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচার এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকার পর মামলাটি এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আবরারের পরিবার দ্রুত আপিল শুনানি শেষ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে তারা চান, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করা হোক।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
তদন্ত শেষে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মামলাটির বিচার শুরু হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১ রায় দেন। আদালত ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে যায়। পাশাপাশি আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন পাওয়া কয়েকজন আসামি আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। এসব আবেদন এখন আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আপিল বিভাগে শুনানি শেষে রায় হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইন অনুযায়ী আরও কয়েকটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
দ্রুত শুনানি চান আবরারের পরিবার
মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য আবরারের পরিবারের পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে পরিবারের সদস্যরা সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেন।
এ সময় তারা আপিল বিভাগে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।
পরিবারের বক্তব্য, হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত বিচার শেষ হয়নি। তারা দ্রুত শুনানি শেষ করে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত চান।
শুনানিতে বিলম্ব করবে না রাষ্ট্রপক্ষ
আবরার হত্যা মামলার আপিল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্ব করবে না বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো মুলতবি চাওয়া হবে না। এমনকি এক দিনের জন্যও শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করা হবে না।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দ্রুত এই হত্যার বিচার শেষ হওয়া প্রয়োজন। মানুষ মামলাটির রায় কার্যকর হতে দেখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ সেই অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের সাজা বহাল রাখায় রাষ্ট্রপক্ষ নতুন করে আপিল করেনি বলেও জানান তিনি।
আবরার হত্যাকাণ্ডকে ফ্যাসিবাদ আমলের একটি চরম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তাঁর বক্তব্য, সে সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করেও পার পাওয়ার একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। তবে অপরাধ করলে বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়, এই মামলার রায়ের মাধ্যমে সেটি প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আসামিপক্ষের বক্তব্য কী
আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চার থেকে পাঁচজন আসামির পক্ষে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। এসব আবেদনের এখনো শুনানি হয়নি।
শুনানি হলে সর্বোচ্চ আদালত থেকে আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা করছেন তারা।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামি
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ উজ জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
যাবজ্জীবন বহাল থাকা পাঁচজন
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।
আবরার হত্যার সাত বছর পেরিয়ে গেছে। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে রায় হয়েছে। এখন মামলাটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আপিল বিভাগে শুনানি।
আবরারের পরিবার দ্রুত শুনানি ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এখন তাদের দৃষ্টি সর্বোচ্চ আদালতের দিকে।

