বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের খাতভেদে ২৩টির বেশি দপ্তর থেকে প্রায় ১৫০ ধরনের অনাপত্তি, লাইসেন্স ও ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব দীর্ঘ প্রক্রিয়া এখন ব্যবসা-বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক ধাপেই ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। এর পাশাপাশি ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়, যা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি। এরপর কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর নিবন্ধন এবং মূল্য সংযোজন কর নিবন্ধনের মতো জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। পাশাপাশি পরিবেশ ছাড়পত্র, পরিবেশ সনদ, ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার লে-আউট প্ল্যান, নির্মাণ অনুমোদন এবং শিল্প সংক্রান্ত নিবন্ধনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা পার করতে হয় উদ্যোক্তাদের।
এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া পেরিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কেউ কেউ কারখানা বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকে কর্মসংস্থান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে লোকসান সত্ত্বেও পুরোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখছেন।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার বিভিন্ন নীতিসহায়তার কথা বললেও বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ব্যবসার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের কারখানা স্থাপনের সময় নারায়ণগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন পাঁচ বছর ধরে আটকে রেখেছিলেন।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর আদায়ে।
তিনি জানান, প্রতি বছর নিয়মিত আয়কর ও কর পরিশোধ করা হলেও হঠাৎ করে পাঁচ থেকে ছয় বছর পর ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি টাকার কর দাবির নোটিস পাঠানো হয়। পরে হিসাব করলে দেখা যায় প্রকৃত পাওনা অনেক কম, কখনও লাখ টাকারও কম বা কোনো পাওনাই থাকে না। তবুও এমন নোটিসে অনেক ব্যবসায়ী মানসিক চাপে পড়ে যান। তার অভিযোগ, এ ধরনের হয়রানির ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।
দোকান মালিক সমিতির এই ব্যবসায়ী নেতা জানান, আয়করের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে অতীত বছরের জন্য বড় অঙ্কের নোটিস পাঠানো হয়, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি জানান, তাদের আবেদন হলো—প্রতি বছরের কর হিসাব একই বছরেই চূড়ান্ত করা হোক, যাতে পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি না হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ব্যবসার বর্তমান চিত্র হতাশাজনক ও অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্কজনক। এ পরিস্থিতির জন্য তারা সরকারি ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকেই দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, ব্যবসা শুরু করতে গেলে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয় এবং নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এসব প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক খরচের চাপও থাকে বলে তারা দাবি করেন।
জানা যায়, ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধন, সাইনবোর্ড খরচ, লাইসেন্স ফি এবং স্থানীয় অনুমোদনসহ বিভিন্ন ধাপে আলাদা আলাদা খরচ বহন করতে হয় উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি জমি বা স্থাপনার অনুমোদন, ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্সের মতো অতিরিক্ত ব্যয়ও যুক্ত হয়। ফলে অনেক উদ্যোক্তার কাছে ব্যবসা শুরু করাই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এই জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণেই ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের সর্বশেষ মূল্যায়নে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। যদিও এরপর এ মূল্যায়ন বন্ধ রয়েছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ই-গভর্ন্যান্স ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সেবা সহজ করার উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে উদ্যোক্তারা এখনও নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ ধরনের সেবা দিলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি। অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়া গেলেও পরিদর্শন ও যাচাই কার্যক্রম এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হয়। এছাড়া অনলাইন পোর্টালের কারিগরি সমস্যার কারণে ফি প্রদান ও নথি আপলোডেও দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
বর্তমানে দেশে ব্যবসা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনলাইনে হলেও ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর, ভ্যাট সনদ ও পরিবেশ ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন অনুমোদন পেতে গড়ে ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস বা তারও বেশি সময় লাগে। একই সঙ্গে জমি নিবন্ধন, বিদ্যুৎ সংযোগ, কর প্রদান এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোও দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে।
পরিবেশ ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, শিল্প নিবন্ধন ও অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সবুজ, কমলা বা লাল ক্যাটাগরির ছাড়পত্র পেতে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লেগে যায়। এই ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ শুরু করা বা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব হয় না।
এরপর বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়া। রাজউক, সিডিএ বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নকশা ও নির্মাণ অনুমোদন পেতে অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে জমির দাম, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য এবং ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়তে থাকায় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে উদ্যোক্তারা জানান।
শিল্প উৎপাদনে যাওয়ার পরও নতুন আরেকটি বাধার মুখে পড়তে হয় উদ্যোক্তাদের। শিল্প আইআরসি বা শিল্প আমদানি নিবন্ধন সনদ ছাড়া শুল্কমুক্ত বা রেয়াতি হারে কাঁচামাল ও ভারী যন্ত্রপাতি আমদানি করা যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কারখানা চালু হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুতে বিলম্ব হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ার সেফটি প্ল্যান এবং লে-আউট অনুমোদন প্রক্রিয়াও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় জটিলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের নামে দীর্ঘ পরিদর্শন প্রক্রিয়া প্রকল্প বাস্তবায়নকে ধীর করে দেয়। ফায়ার লে-আউট প্ল্যান এবং সেফটি নো অবজেকশন সনদ ছাড়া কোনো শিল্প প্রকল্পে ব্যাংক ঋণও ছাড় করা হয় না।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি বলেন, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তার ভাষায়, তৈরি পোশাক খাতে বস্ত্র অধিদপ্তরের মাধ্যমে এসব অনুমোদন এক জায়গায় পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে উদ্যোক্তাদের এখনো একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। এদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজীকরণে আজ রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে এ সভা হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে।
সভায় কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, শিল্প নিবন্ধন, পরিবেশ সনদ, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং শিল্প আইআরসিসহ বিভিন্ন সেবা সহজীকরণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় কমানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছ থেকে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সভায় অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

