জ্বালানি তেলের পর এবার সংকট দেখা দিয়েছে সিএনজি সরবরাহেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা যাচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস নিতে পারছেন না। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক, গণপরিবহন চালকসহ সাধারণ মানুষ।
জ্বালানি তেলের সংকটের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই অনেক পাম্পে আগের মতো দীর্ঘ লাইন দেখা যায়নি। এ কারণে সিএনজি সংকট নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো মহল অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অতীতে বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে প্রকৃত কারণ বের করতে কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যেই সিএনজি বিক্রির কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংকটের মধ্যেই সংগঠনটি কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘটের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এদিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনেই বর্তমানে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ নেই। যেসব স্টেশনে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অনেক চালককে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্যাস নেওয়ার জন্য।
টানা কয়েকদিনের এই সংকটের কারণে অনেক গাড়িচালক বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ যাত্রীরা পড়েছেন বাড়তি ভোগান্তিতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
জ্বালানি তেলের সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় রাজশাহীর বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। তবে পাম্প মালিকদের সংগঠন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেলের সরবরাহে প্রকৃত কোনো সংকট নেই।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, যেকোনো সংকটের সময় গুজব কত দ্রুত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব তথ্য অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বর্তমান সময়ে এটি দেশের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু সিএনজি স্টেশনেই নয়, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়িতেও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেস ও বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে সমস্যায় পড়ছেন মানুষ। অনেকেই বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্টের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু প্রতিদিন তিন বেলা বাইরে খাওয়ার বাড়তি খরচ বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন রেস্টুরেন্টের খাবারের ওপর নির্ভর করাও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। এতে বাড়ছে বিদ্যুৎ খরচ। আগামী মাসে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপও সামলাতে হবে তাদের। অথচ গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও নির্ধারিত গ্যাস বিল থেকে কোনো ছাড় মিলছে না।
দুই চুলার সংযোগ থাকা গ্রাহকদের মাস শেষে নির্ধারিত ১ হাজার ৮০ টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়, গ্যাসের চাপ থাকুক বা না থাকুক। ফলে একদিকে বিকল্প জ্বালানির খরচ, অন্যদিকে রেস্টুরেন্টের খাবারের বাড়তি ব্যয়—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের মূল কারণ আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা। বিশেষ করে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমে গেছে।
গত বুধবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বরং বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি পূরণ করা হয় আমদানিকৃত এলএনজির মাধ্যমে। ফলে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা তৈরি হলেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্যাস সরবরাহে।
গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে শুধু বাসাবাড়ি নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। এতে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো প্রয়োজনীয় সেবা যেন সাধারণ মানুষ সহজে এবং সহনীয় খরচে পেতে পারে, সেটিই প্রত্যাশা। এখন বড় প্রশ্ন—সংকট কাটতে আর কত সময় লাগবে এবং এর আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত কতটা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।
বাংলাদেশের ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত রয়েছে—এটি প্রমাণিত। শুধু স্থলভাগ নয়, দেশের গভীর সমুদ্র এলাকাতেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গত কয়েক দশকে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে দেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি খাতের এই নির্ভরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের বদলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু পক্ষ এর মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছে বলেও সমালোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, স্থলভাগ ও সমুদ্র—দুই জায়গাতেই গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনার আওতায় অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে ভালো। বিশ্বব্যাপী গ্যাস অনুসন্ধানে গড়ে প্রতি সাতটি কূপ খননের বিপরীতে একটি সফল হওয়ার নজির রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি তিনটি কূপে একটি সফল হওয়ার হার দেখা গেছে। অর্থাৎ অনুসন্ধানে সাফল্যের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিন নতুন ক্ষেত্র খোঁজার কাজ গুরুত্ব পায়নি।
অনেকে মনে করেন, গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান চালানো হলে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত গভীর অনুসন্ধান হয়নি। সমুদ্রের যেসব ব্লক নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে, সেখানেও গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় নেওয়া হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগেও বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশ দেশীয় উৎস থেকে এলেও বর্তমানে আমদানির অংশ অনেক বেড়েছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
যদি দেশের জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে কিনতে হয়, তাহলে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। উৎপাদন খরচ বাড়লে শিল্প ও ব্যবসা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর চূড়ান্ত চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার এবং পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক সময় সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলিন্ডার গ্যাস দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এর ব্যবহার বাড়লে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু সংকটের সময় বিকল্প হিসেবে নয়, সামগ্রিক জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবেই বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ভবিষ্যতে বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর ফলে পুরোপুরি সিলিন্ডারনির্ভরতা তৈরি হলে বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যবসায়ীদের ওপর কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে গ্রাহকদের সিলিন্ডারের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা। সবচেয়ে কম আয়ের মানুষটিও যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, রান্না করা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মতো মৌলিক সেবা গ্রহণে অযথা ভোগান্তিতে না পড়েন—এ নিশ্চয়তা দেওয়াই হওয়া উচিত জ্বালানি নীতির প্রধান উদ্দেশ্য।

