বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার অন্তত ৮০ শতাংশ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। তাঁর ভাষায়, চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশের মানুষ একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। অনেকেই চাকরি ও ব্যবসা হারিয়েছেন। পরে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁর মতে, এই দীর্ঘ সময়ের বাজেটগুলোতে সাধারণ মানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এবার শ্রেণি, পেশা ও ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিককে বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বক্তব্য দেন। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও লুণ্ঠন হয়েছে, দুর্বল হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়ন সহজ ছিল না। তারপরও সবার কথা বিবেচনায় রেখে বাজেট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। অতীতে অর্থনীতির সুফল সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। এখন সেই অর্থনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই বাজেটের বাইরে কোনো নাগরিক নেই।
সংবাদ সম্মেলনে কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অর্থমন্ত্রী বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের কাছে দায়িত্ব দেন। চেয়ারম্যান জানান, নতুন করে কালোটাকা সাদা করার কোনো সুযোগ বাজেটে রাখা হয়নি। আগের বছরের একটি বিধান বহাল রয়েছে। জমি বিক্রির ক্ষেত্রে মৌজামূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্যের কারণে যে অর্থ অঘোষিত হিসেবে গণ্য হয়, সেটির ওপর ২০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি ভবিষ্যতে পর্যালোচনা করা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জমির মৌজামূল্য সাধারণত প্রকৃত বাজারদামের চেয়ে কম থাকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ এখনও হয়নি। এজন্য একটি জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক সংকট অনেক সময় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়। ১১ বছর ধরে নতুন বেতনকাঠামো হয়নি, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। করজালের পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সবাইকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আর্থিক খাতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হবে না। ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমেও কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি; সমীক্ষার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষই সুবিধা পাচ্ছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে তহবিলের ব্যয় বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কয়েক মাসের সমস্যা নয় এবং প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও নয়। সঠিক নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করছে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের বন্দরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো গেলে সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সূচকে সহজে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান নিচের দিকে। একটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এই জটিলতা কমিয়ে প্রক্রিয়াকে সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে একটি নতুন বিনিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। নীতিমালা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কার্যালয়ে বিশেষ ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
জ্বালানি খাত নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, অতীতে দেশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এবং বাপেক্সকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি এবং বিভিন্ন অনিয়ম বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় ব্যাংকগুলোর প্রধান দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে ঋণ সহায়তা দেওয়া। সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাবে। অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানান, চলতি অর্থবছরে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরে কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে সুকুক বন্ড ও বন্ডবাজারের উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়েও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরিশালের শীতলপাটিসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যের নকশা উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ডিজাইনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এতে বেসরকারি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে যুক্ত করা হবে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় নীতিগত সরঞ্জাম রয়েছে এবং জরুরি তারল্য সহায়তাও দেওয়া হবে। তিনি জানান, ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত বর্তমানে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি, যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে।
গভর্নর আরও বলেন, ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে এবং এসব অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের হার খুবই কম হলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে কিছু অর্থ ফেরত এসেছে।
নিজের ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, তাঁর পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠান কখনও বন্ধ হয়নি, রপ্তানি কার্যক্রমও বন্ধ ছিল না। করোনাভাইরাসসহ বিভিন্ন কারণে ঋণ পরিশোধে কিছু বিলম্ব হলেও ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।

