দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিকে শুধু প্রবৃদ্ধিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একগুচ্ছ নতুন কর্মসূচি ও তহবিল ঘোষণার মাধ্যমে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্য, সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, ব্লু ইকোনমি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রবাসীকল্যাণসহ বিভিন্ন খাতকে ঘিরে মোট ১০টি নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের দাবি, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থনীতিকে আরও বহুমাত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কর্মসংস্থানমুখী করতে নতুন সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোই এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কেবল ঘোষণা নয়, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়নে। অতীতে বিভিন্ন তহবিল ও প্রণোদনা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই নতুন কর্মসূচিগুলোর সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন উদ্যোগগুলো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এগুলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি স্থবির মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য সহজ হবে না।
সৃজনশীল অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগ:
তরুণদের সৃজনশীল শক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে আন্তর্জাতিক মানের সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হবে।
এ উদ্যোগের আওতায় গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত ক্যামেরার যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে। কনটেন্ট নির্মাতা, শিল্পী ও সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সহায়তা:
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইডিসিওএল, বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা বাড়াতে বার্ষিক টার্নওভার করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্টার্টআপ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা:
উদ্ভাবনভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে চালু করা হচ্ছে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’। এর আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৯ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি তাদের জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার কর সুবিধারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমুদ্র অর্থনীতিতে নতুন গবেষণা তহবিল:
দেশের বিশাল সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ১০০ কোটি টাকার ‘ব্লু ইকোনমি গবেষণা তহবিল’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, খনিজ অনুসন্ধান, সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন এবং নতুন শিল্প খাতের সম্ভাবনা যাচাইয়ে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।
স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদারে দুই তহবিল:
স্বাস্থ্য গবেষণা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে দুটি পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব এসেছে। সমন্বিত স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান গবেষণা তহবিলের জন্য ১০০ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা তহবিলের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। সরকারের মতে, নতুন রোগ নিয়ে গবেষণা, চিকিৎসা উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে এসব অর্থ ব্যবহার করা হবে।
জলবায়ু ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব:
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই পরিমাণ অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিলেও বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি কার্যক্রমে ১৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ:
সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম সচল রাখতে ১৭ হাজার কোটি টাকার পরিচালন ঋণ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে গতি আনতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রবাসীদের জন্য আসছে নতুন কার্ড:
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সেবা সহজ করতে চালু করা হবে ‘প্রবাসী কার্ড’। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং, বিমা, কল্যাণ সেবা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া এবং নর্থ মেসিডোনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্য নিয়ে ঘোষিত এসব কর্মসূচি নিঃসন্দেহে বড় প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, তহবিল গঠন বা প্রণোদনা ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার কার্যকর বাস্তবায়ন। ফলে নতুন অর্থনীতির যে স্বপ্ন বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে, তা কতটা বাস্তবে রূপ পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

