বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—এই বিশাল বাজেট চার বছর ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালবে, নাকি তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে?
চলতি মাসের ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ।
সূত্র অনুযায়ী, এই বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধিই নয় বরং স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজছে। এই বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগনির্ভর ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার।
তবে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং রাজস্ব নীতি, ব্যয়ের ধরন, জবাবদিহিতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চাল, গম, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন পণ্যে বিদ্যমান উৎস করের হার কমিয়ে অভিন্ন ০.৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে ব্যয় কমবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর কমানোর সুফল তখনই ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে যখন বাজার তদারকি কার্যকর হবে। অন্যথায় ব্যবসায়িক পর্যায়ে কর হ্রাসের সুবিধা আটকে গেলে খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা নাও যেতে পারে।
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্ধারিত রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলে সরকারকে পরোক্ষ কর, ভ্যাট সম্প্রসারণ কিংবা আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মূল্যস্ফীতি আবারো উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে, বাজেট ঘোষণার সময় সরকার দাবি করেছে যে কিছু ক্ষেত্রে করছাড়, ভ্যাট সংস্কার এবং আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বাজারে স্বস্তি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে কিছু পণ্যে কর হ্রাস ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে সহায়তা করবে বলে সরকারের ব্যাখ্যা।
|
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলের পরিবারই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ অনুভব করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া “নীরব আয় সংকোচন” এখনো কাটেনি। অর্থাৎ মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সেই আয়ের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এদিকে বাজেটে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের মতে, এসব খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই ব্যয়ের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন বাজেটকে ঘিরে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে মূল্যস্ফীতি কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সরকারি প্রত্যাশা। অন্যদিকে রয়েছে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিদ্যমান মূল্যচাপের মতো চ্যালেঞ্জ।
ফলে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে নতুন বাজেট মূল্যস্ফীতি কমাবে নাকি বাড়াবে। এর সফলতা নির্ভর করবে কর নীতির বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণের কৌশল, বাজার তদারকির কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার ওপর। বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত স্বস্তি আসবে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের বাজার পরিস্থিতিতেই।

