এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। জাতির নতুন স্বপ্ন বিনির্মাণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে আইনজীবীরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান রচনায় আইনজীবীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবী পেশার নিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একটি সাংবিধানিক সংস্থা। আইনজীবীদের নিবন্ধন, সনদ প্রদান এবং শৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এই সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বার কাউন্সিলের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি পরীক্ষা পরিচালনা, সনদ প্রদান এবং আইনজীবীদের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ। পাশাপাশি কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে এই সংস্থার। সংস্থাটির নেতৃত্বে একজন চেয়ারম্যান থাকেন, যিনি সাধারণত বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে থাকেন। এছাড়া নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়।
১৯৭২ সালে গঠিত এই সংস্থাটি মূলত বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-এর আওতায় পরিচালিত হয়। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত এক আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠালাভ করে। এর সদস্য সংখ্যা রাখা হয় ১৫ জন। প্রতিটি কমিটির মেয়াদ থাকে ৩ বছর। এরমধ্যে পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের সভাপতি থাকেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। বাকি ১৪ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জন আইনজীবীদের মধ্য থেকে তাদের ভোটে নির্বাচিত, বাকি ৭ জন প্রতিটি গ্রপ থেকে একজন করে ৭টি গ্রুপে বিভক্ত স্থানীয় আইনজীবী সমিতিগুলির সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় ১৩ জন সদস্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন আইনজীবী। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী আইনজীবী সমাজ পরিবর্তনে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারেন। আইনজীবীদের বলা হয় সমাজ বিনির্মাণের কারিগর বা Social Engineer। সমাজ সংস্কার কিংবা জাতির সংকটে সব সময় আইনজীবীরা অসামান্য ভূমিকা পালন করেন তাদের অর্জিত মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর সৃজনশীলতা দিয়ে। আইনজীবীরা সমাজের মধ্যেই আরেকটি সমাজ (Community with a community)।
আইনজীবী সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিচার ব্যবস্থায় পেশাগত মান উন্নয়নে বার কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে নতুন আইনজীবীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার মান ধরে রাখতেও কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
বার কাউন্সিল গঠনের প্রেক্ষাপট:
১৭৭৪ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগকৃত অ্যাটর্নিদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব লেটার্স প্যাটেন্টের ১১ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালতের ওপর ন্যস্ত হয়। ১৭৯৩ সালের ৭ নং প্রবিধান অনুযায়ী সদর দেওয়ানি আদালতে ও অধস্তন কোম্পানি আদালতগুলিতে আইনপেশায় নিয়োজিত উকিলদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ করতো সুপ্রিম কোর্ট।
১৮৬২ সালে সদর দেওয়ানি আদালত ও সদর নেজামত আদালত তুলে দিয়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে জজিয়তি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। উক্ত হাইকোর্ট তার আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল (রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োগকৃত সর্বোচ্চ আইনকর্মকর্তা), উকিল, কৌঁশুলিদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পায়। তখন বেশিরভাগ আইনজীবীরা ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড থেকে ডিগ্রি অর্জন করা ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ অথবা স্কটল্যান্ডের ফ্যাকাল্টি অফ অ্যাডভোকেটস-এর সদস্য ছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলদের অনুমোদন সাপেক্ষে আইনজীবীরা কলকাতা হাইকোর্টে হাজিরা দেয়া ও ওকালতি করতে পারতেন এবং ওই আদালতের আপিল বিভাগ ও অন্যান্য অধস্তন আদালতে ওকালতি করার অনুমতি নিতেন। সেসময় হাইকোর্টে আইন চর্চাকারীরা ছিলেন অ্যাডভোকেট বা ব্যারিস্টার যাদের ইংরেজি আইনে ডিগ্রি ছিলো। তবে এ পদ্ধতিতে দেশীয় ভারতীয় আইনজীবী যাদের ব্রিটিশ আইনের কোনো ডিগ্রি নেই তারা অধস্তন আদালত ছাড়া হাইকোর্টে মূল বিভাগে কাজ করার তেমন কোনো অধিকার পেতেন না, তাদের পদবী ছিলো উকিল বা ভাকিল (Vakil), এরা মূলত মুসলিম ও হিন্দু আইন এবং মুঘল দেওয়ানি ও ফৌজদারী আইনে শিক্ষা নিতেন ।
তাই উপমহাদেশে একটি সর্বভারতীয় বার গঠন এবং অ্যাডভোকেট ও উকিলদের মধ্যে পার্থক্য বিলোপ করার জন্যে জোরালো দাবি ওঠে। এ দাবির প্রেক্ষিতে ১৯২৩ সালে ইন্ডিয়ান বার কমিটি গঠন করা হয়। এর সভাপতি ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড চ্যামিয়ার। ১৯২৪ সালে ওই কমিটি প্রতিবেদন পেশ করে এবং ইন্ডিয়ান বার কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯২৬ কার্যকর করে।
ভারতের বার কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিটি হাইকোর্টে যৌথ সংগঠন হিসেবে একটি করে বার কাউন্সিল গঠনের বিধি প্রবর্তন করা হয়। ওইসব কাউন্সিলে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত প্রতিটি বার কাউন্সিলে অ্যাডভোকেট জেনারেল, হাইকোর্ট কর্তৃক মনোনীত ৪ জন সদস্য এবং হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটদের নিজেদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ১০ জন সদস্য থাকতেন।
তখন হাইকোর্টের অনুমতি সাপেক্ষে বার কাউন্সিলকে আইনজীবীদের নিবন্ধন ও তাদের নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুন তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে কোনও ব্যক্তিকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে হাইকোর্ট আপত্তি জানালে তা খর্ব করার অধিকার বার কাউন্সিলের ছিলো না। এ আইনে হাইকোর্টের মূল বিভাগে আইন ব্যবসায়ে আগ্রহী আবেদনকারীদের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা এবং তাদের গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান এবাং কী কী শর্তে বা পরিস্থিতিতে তারা ওই আদালতের অধীনে আইনব্যবসা করতে পারবেন তার সবটাই নির্ধারণ করতো কলকাতার হাইকোর্ট।
হাইকোর্ট আইনজীবীদের কোনও অসদাচরণের অভিযোগের তদন্তকার্য বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালের উপর ন্যস্ত করতে পারত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীকে তিরস্কার, তার আইন ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারত। আইনজীবীদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল হাইকোর্টের হাতে, বার কাউন্সিল ছিল নেহাৎ একটি উপদেষ্টা সংগঠন। কালক্রমে কলকাতা হাইকোর্ট তার বিধিবিধান উদার করে এবং ব্যারিস্টার নন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ডিগ্রি নেই এমন ভারতীয় উকিলদের হাইকোর্টে মূল মামলা পরিচালনার অনুমতি দেয়।
১৯৬৫ সালের লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ১৯৬৫ সালের এই আইনের ফলে সমগ্র দেশের জন্য একটি এবং পাকিস্তানের প্রতি দুই প্রদেশের জন্য একটি করে বার কাউন্সিল গঠিত হয়। এতে ছিলেন ১৪ জন নির্বাচিত সদস্য এবং পদাধিকারবলে একজন সভাপতি। এ আইনে ব্যারিস্টার ও নন-ব্যারিস্টার এবং অন্যান্য শ্রেণীর আইনজীবীদের মধ্যকার পার্থক্য লোপ পায় এবং অ্যাডভোকেট পদবীতে দুই শ্রেণীর আইনজীবীর নিবন্ধনের বিধান চালু হয়; এক শ্রেণী হাইকোর্টের জন্য এবং অপর শ্রেণী অধস্তন আদালতসমূহের জন্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশবলে ১৯৬৫ সালের আইন বাতিল করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বার কাউন্সিল অর্ডার অ্যান্ড রুলস, ১৯৭২ প্রণয়ন করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়।
বার কাউন্সিলের প্রশাসনিক কার্যাবলি:
বাংলাদেশের নাগরিক ও ন্যূনতম ২১ বছর বয়স্ক যেকোনো ব্যক্তি যিনি আইনের স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী বা ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টার হিসেবে নিবন্ধিত, অন্যূন ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের অধীনে ৬ মাসের শিক্ষানবিসী সম্পন্ন করে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি পরিশোধের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের অধীনস্থ আদালতসমূহে আইনব্যবসা করার লক্ষ্যে নিবন্ধনের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হন।
নিবন্ধনের জন্য বার কাউন্সিল কর্তৃক পরিচালিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অতিরিক্ত ফি প্রদানের মাধ্যমে তিনি অ্যাডভোকেট হিসেবে নিবন্ধিত হন। কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তে বার কাউন্সিল আইনজীবী সমিতি ও আইনজীবীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। নিবন্ধন লাভের পর প্রত্যেক অ্যাডভোকেটকে কোনো না কোনো আইনজীবী সমিতির সদস্য হতে হয়।
আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ তদন্ত ও বিচারের জন্য বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৯ সালে এই জাতীয় পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল ছিল। একটি ট্রাইব্যুনাল কোনও আইনজীবীকে তিরস্কার বা স্থগিত করতে বা অনুশীলন থেকে সরিয়ে দিতে পারে। এটি ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৩৭৮টি অভিযোগের বিষয়ে শুনানি করেছে। এসব অভিযোগে ৯ জন আইনজীবী তাদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন এবং ৬ জনকে সীমিত সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ আইনজীবী গঠনে চ্যালেঞ্জ:
আইন পেশায় প্রবেশের সনদ পরীক্ষা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ নয়। এটি দেশের বিচারব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের গুণগত মান নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই পরীক্ষার সিলেবাস, প্রশ্নপদ্ধতি এবং মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনা সামনে আসছে, তা একটি বড় বাস্তব প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—আমরা কি সত্যিকারের দক্ষ আইনজীবী তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থী তৈরি করছি?
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালিত এই সনদ পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে কাজ করছে। প্রতি বছর হাজারো আইন স্নাতক এই পরীক্ষার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে আইনজীবী সমাজের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান কাঠামো সময়ের চাহিদার তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
সিলেবাস ঘিরে প্রধান বিতর্ক:
আইন পেশায় প্রবেশের সনদ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর সিলেবাস। আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবী মহলের একাংশের মতে, বর্তমান সিলেবাস সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা ও আদালত চর্চার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এই সিলেবাস ঘিরে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালিত এই সনদ পরীক্ষা আইন পেশায় প্রবেশের প্রধান দ্বার হিসেবে কাজ করে। তাই এই পরীক্ষার সিলেবাস কেবল একটি একাডেমিক কাঠামো নয়, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের প্রস্তুতির মানদণ্ড হিসেবেও বিবেচিত হয় কিন্তু সময়ের সঙ্গে আইন, আদালত চর্চা এবং সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হলেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন সিলেবাসে কতটা ঘটছে—এ নিয়েই মূল প্রশ্ন।
আইনজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সিলেবাস হালনাগাদের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর। নতুন আইন, সংশোধনী এবং বিচারিক ব্যাখ্যা নিয়মিতভাবে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় পিছিয়ে থাকে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা যে পাঠ্যসূচি অনুসরণ করেন, তা অনেক ক্ষেত্রে সমসাময়িক আইনি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিল খুঁজে পায় না।
এই কারণে এক ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে একাডেমিক প্রস্তুতি ও বাস্তব আদালত চর্চার মধ্যে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য যে জ্ঞান অর্জন করছেন, তা বাস্তব মামলার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবসময় যথেষ্ট হয়ে উঠছে না বলে অভিজ্ঞ মহলের মত। এতে করে নতুন আইনজীবীদের একটি অংশ পেশাগত জীবনের শুরুতেই বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সিলেবাস কতটা বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা তৈরি করছে। আইন পেশা মূলত যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান কাঠামোতে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেখানে বাস্তব প্রয়োগ ও কেস বিশ্লেষণের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় আইনকে মুখস্থনির্ভর বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এতে তাদের চিন্তাশক্তি, যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দক্ষতা যথাযথভাবে বিকশিত হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নও সামনে আসছে।
এছাড়া আধুনিক যুগে আইনচর্চার ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রমাণ, সাইবার অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সিলেবাসে এসব নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন কতটা আছে, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, আধুনিক আইনি বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকলে ভবিষ্যৎ আইনজীবীরা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সমস্যায় পড়বেন।
সব মিলিয়ে সিলেবাস নিয়ে প্রধান প্রশ্নটি এখন আর শুধু পরিবর্তনের দাবি নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত পুনর্বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আইন পেশায় প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যদি সময়োপযোগী না হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু পরীক্ষার্থীদের ওপর নয়, বরং পুরো বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ মানের ওপরও পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় আইনজীবী সমাজের প্রত্যাশা হলো, সিলেবাসকে আরও গতিশীল, বাস্তবমুখী এবং আধুনিক আইনি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ আইনজীবীরা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে সত্যিকার অর্থে দক্ষ ও কার্যকর পেশাজীবী হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।

