বাংলাদেশের আইন পেশাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ পর্যায়ে নিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তার মতে, আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বার কাউন্সিলের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী প্রজন্মের কাছে আইন পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর রমনা এলাকায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবনে ঢাকা ব্যাংকের নতুন উপশাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, অন্যান্য পেশার মতো আইনজীবীদের জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ বছর আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হতে পারে।
তার মতে, সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারকদের চাকরিতে প্রবেশের পর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও আইনজীবীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। সাধারণত সনদ পাওয়ার পর একজন আইনজীবী জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করতে করতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আইনি জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতাকে আরও শাণিত করতে বার কাউন্সিলের কার্যকর প্রশিক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন।
বার কাউন্সিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বিষয়টিও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পাশাপাশি বহিরাগত নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বার কাউন্সিলকে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় বিধিবদ্ধ দায়িত্বের আওতায় বার কাউন্সিলের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের আইন পেশার উন্নয়নে বার কাউন্সিলের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
তিনি বলেন, বার কাউন্সিলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বা দুর্নীতির জায়গা বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষা, মেধা, প্রজ্ঞা, শ্রম ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে আইন শিক্ষার্থী ও তরুণ আইনজীবীদের কাছে এটি ভবিষ্যৎ গড়ার আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে ওঠে।
বার কাউন্সিলের বর্তমান নেতৃত্বকে তরুণ, গতিশীল ও দক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করলে প্রতিষ্ঠানটিকে আইন শিক্ষার্থী ও তরুণ আইনজীবীদের জন্য একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী ব্যাংকিং খাতের কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঋণ পাওয়ার জন্য একজন উদ্যোক্তা সব শর্ত পূরণ করার পরও যদি সময়মতো অর্থ ছাড় না পান, তাহলে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অথচ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ওই উদ্যোক্তার সম্পত্তি বন্ধক রাখে এবং চেকও গ্রহণ করে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণপ্রত্যাশী ব্যক্তি কোথায় যাবেন—এই প্রশ্নের সমাধান খোঁজা জরুরি।
ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের আইনি ঝুঁকির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার বক্তব্য, অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে কোনো জুনিয়র কর্মকর্তা ঋণের ফাইল প্রক্রিয়াজাত করেন বা তাতে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তী সময়ে ওই ঋণ নিয়ে অনিয়ম বা মামলা হলে শুধু স্বাক্ষর থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট জুনিয়র কর্মকর্তাকেই আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়। চাকরি রক্ষার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাতে কর্মকর্তারা অযৌক্তিক আইনি ঝুঁকিতে না পড়েন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—একদিকে আইনজীবীদের পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো, অন্যদিকে বার কাউন্সিলের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তার প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের মাধ্যমে বার কাউন্সিল শুধু আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পেশাগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল এবং ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।

