আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ছিল সামিট গ্রুপের। সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। এবার খাতটিতে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে শিল্পগোষ্ঠীটি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামিট এলএনজি টার্মিনাল-২ লিমিটেডের (এসএলএনজি-২) ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) প্রকল্প বাতিল করে। বাতিল হওয়া এই প্রকল্প ফিরে পেতে আদালতের পাশাপাশি সরকারের সঙ্গেও সমঝোতার চেষ্টা করছে সামিট।
জানা গেছে, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করেছে সামিট এলএনজি টার্মিনাল-২। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজছে প্রতিষ্ঠানটি। সমঝোতা হলে আগামী ১১ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টির নিষ্পত্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সমঝোতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছে সামিট। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব পিআর মিডিয়া মোহসেনা হাসান বলেন, “সরকারের সঙ্গে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় এখন কোনো অগ্রগতি নেই। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।”
দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান:
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য চাওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক আলমগীর হোসেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে জমা দিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আজিজ খান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭১১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগেও পৃথক অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সামিট গ্রুপের মালিকপক্ষের ১৯১টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আজিজ খানসহ পরিবারের ১৬ সদস্যের সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে তলব করা হলেও তারা হাজির হননি। তবে সামিটের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তারা দুদক থেকে পাঠানো কোনো নোটিশ বা চিঠি পাননি।
আজিজ খান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান প্রসঙ্গে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অনুসন্ধান চলছে। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির অভিযোগ যাচাইয়ের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এরপর অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সামিট গ্রুপের দীর্ঘদিনের প্রভাব, প্রকল্প বাতিলের পর আইনি লড়াই এবং দুদকের চলমান অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অবস্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সামিট গ্রুপের এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তকে ঘিরে আইনি লড়াই, সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা এবং দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীটি।
সামিট এলএনজি টার্মিনাল-২ লিমিটেডের (এসএলএনজি-২) ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) প্রকল্প বাতিলের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রকল্প ফিরে পেতে আদালতের আশ্রয় নিয়েছে তারা।
এলএনজি টার্মিনাল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে মামলা:
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর এসএলএনজি-২-এর এফএসআরইউ প্রকল্পের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সামিট গ্রুপকে চিঠি দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর দুই দিন পর, ৯ অক্টোবর, চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায় সামিট। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সেই আবেদনে সাড়া না পাওয়ায় ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্টে রিট দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি। মামলার নম্বর ১৮১৬/২০২৫।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১১১ বার শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়েক দফায় মামলাটি কার্যতালিকা থেকেও বাদ পড়ে। বর্তমানে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি চলছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করে সামিটের পক্ষ থেকে আদালতে একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন। আগামী ১১ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পের চুক্তি বাতিলের পর থেকেই সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে আসছে সামিট গ্রুপ। চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে এসএলএনজি-২ অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। এসব চিঠিতে চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করে বিষয়টির সমাধান করা প্রয়োজন।
দুদকের আবেদনে ১৯১ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ:
অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৯ মার্চ ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত সামিট গ্রুপের ১৯১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, এসব হিসাবে প্রায় ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ৭৬০ টাকা রয়েছে। দুদকের আবেদনে বলা হয়, সামিট গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এসব ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হিসাবে থাকা অর্থের উৎস ও লেনদেন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে অর্থ স্থানান্তর বা গোপন করার আশঙ্কা থাকায় হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করার আবেদন করা হয়।
আজিজ খান ও পরিবারের সম্পদের হিসাব চেয়েছে দুদক:
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান, তার স্ত্রী এবং মেয়ের সম্পদের হিসাব চেয়ে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক তিনটি নোটিশ দেয় দুদক। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আজিজ খানের নামে ৩৩০ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ১০৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অনুসন্ধানে তার নামে কোনো দায়দেনার তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুদক জানিয়েছে, আয়কর নথি পর্যালোচনায় তার স্থাবর সম্পদের তথ্য উল্লেখ না থাকার বিষয়টি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া আজিজ খানের স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খানের নামে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯২ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ এবং ৯১ কোটি ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮৭ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ ৯২ কোটি ৬২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৯ টাকা বলে উল্লেখ করেছে দুদক।
অন্যদিকে আজিজ খানের মেয়ে আয়েশা আজিজ খানের নামে ৭ কোটি ৬৬ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৭ টাকা মূল্যের স্থাবর এবং ২৭৯ কোটি ৭৭ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ ২৮৭ কোটি ৪৩ লাখ ২২ হাজার ৯৬৪ টাকা বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের দাবি, আয়কর নথিতে দেখানো সম্পদের মূল্য এবং প্রকৃত সম্পদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। পাশাপাশি ঘোষিত আয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে দুদকের অনুসন্ধান শেষে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পরিবারের ১৬ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২৬ জানুয়ারি এ বিষয়ে নোটিশ জারি করে দুদক। নোটিশে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন দিনে কমিশনে হাজির হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলা হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৯ জানুয়ারি, ১, ২, ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি তাদের হাজির হওয়ার কথা ছিল।
দুদকের নোটিশ অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারি হাজির হতে বলা হয়েছিল সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খান, মেয়ে আয়েশা আজিজ খন্দকার এবং ভাই ও সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খানকে।
১ ফেব্রুয়ারি তলব করা হয় আজিজ খানের মেয়ে আজিজা আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান এবং ভাই মোহাম্মদ ফরিদ খানকে। এ ছাড়া ২ ফেব্রুয়ারি হাজির হওয়ার জন্য বলা হয় আজিজ খানের ভাই জাফর উদ্দিন খান, মোহাম্মদ লতিফ খান এবং ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খানকে।
৩ ফেব্রুয়ারি ডাকা হয় পরিবারের সদস্য সালমান খান, সানাদিনা খান ও আজহারুল হক খানকে। আর ৪ ফেব্রুয়ারি হাজির হওয়ার কথা ছিল ফারহান খালেদ খান, ফারহান করিম খান ও ফাদিয়াহ খালেদা খানের। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের কেউই দুদকে হাজির হননি।
পরে সামিট গ্রুপের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তারা দুদক থেকে পাঠানো কোনো নোটিশ বা চিঠি পাননি। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে হাজির হতে পারেননি বলে দাবি করা হয়।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

