সহজ শর্তে ঋণ, কম সুদ কিংবা অল্প সময়ে বিনিয়োগের টাকা কয়েক গুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি—অনলাইনে এমন প্রলোভন এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। কিন্তু এই আকর্ষণীয় প্রস্তাবের আড়ালে থাকা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেকে হারাচ্ছেন কষ্টের জমানো টাকা।
ফোন কল, খুদে বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিভিন্ন মাধ্যমেই প্রতারকরা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, আর্থিক সংকটে থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছাতে ফেসবুককে বিশেষভাবে ব্যবহার করছে প্রতারকচক্র। সাইবার অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণা সম্পর্কে কম ধারণা থাকায় এই শ্রেণির মানুষই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
প্রতারণার কৌশলও সাধারণত খুব সহজ। কোথাও কম সুদে বড় অঙ্কের ঋণের প্রস্তাব, আবার কোথাও অল্প টাকা বিনিয়োগ করে দ্রুত বড় লাভের আশ্বাস দেওয়া হয়।
এর একটি উদাহরণ তৌহিদা আক্তার। এই গৃহিণী ফেসবুকে এমন একটি পেজের সন্ধান পান, যেখানে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছিল। সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র ৫ শতাংশ, যা বর্তমান ব্যাংক ঋণের তুলনায় অনেক কম।
আর্থিক সমস্যায় থাকা তৌহিদা দ্রুত পেজটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পেজটির পরিচয় ছিল ‘আশার আলো ফাউন্ডেশন’ নামে।
ঋণের আবেদনপত্র ও স্ট্যাম্পের জন্য প্রথমে তার কাছ থেকে ৪৫০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর বলা হয়, ১ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। ঋণের দুটি কিস্তি পরিশোধের পর ওই টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়।৫ লাখ টাকার ঋণের আশায় নিজের জীবনের সঞ্চয় থেকে ১ লাখ টাকা জমা দেন তৌহিদা।
কিন্তু টাকা পাঠানোর পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। পেজটির সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।ভুক্তভোগী তৌহিদার ভাষায়, টাকা পাঠানোর পর পেজটি তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ঘটনার পর এতটাই বিব্রত হয়ে পড়েন যে পরিবারের সদস্যদের কাছেও বিষয়টি জানাননি তিনি।
তৌহিদার মতো আরও অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত ভুয়া ঋণ কার্যক্রমের শিকার হয়েছেন।শুধু ফেসবুক পেজ নয়, মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেও চলছে এই প্রতারণা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রাবিউল আলম এমনই একটি প্রতারণার শিকার। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কিছু অ্যাপ সরাসরি ব্যবহারকারীর টাকা হাতিয়ে নেয়। আবার কিছু অ্যাপ ঋণ দেওয়ার কথা বলে পরে অত্যন্ত উচ্চ সুদ দাবি করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুদের হার ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব অ্যাপ মোবাইলে ইনস্টল করার সময় ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পায় প্রতারকরা। ফোনের যোগাযোগ তালিকা, ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য তাদের হাতে চলে যেতে পারে।
ঋণ নেওয়ার পর অস্বাভাবিক সুদ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় হয়রানি ও হুমকি। ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
রাবিউল ‘ফিনক্যাশ’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারিত হন। অ্যাপটিতে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হতো।
এ ধরনের আরও কিছু অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মধ্যে রয়েছে ‘মানি’, ‘পপক্যাশ’, ‘ক্যাশনাও’, ‘দ্রুতঋণ’, ‘ফাস্ট লোন’, ‘সাথী লোন’ ও ‘কুইকলোন’।বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ ধরনের ঋণ দেওয়ার অ্যাপ অবৈধ।
অনলাইন প্রতারণার পরিধি শুধু ঋণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে জুয়া, বাজি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশে এসব কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর তদন্তে কিছু মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ লেনদেন ও অন্যান্য অননুমোদিত কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শনে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ভার্চুয়াল সম্পদ প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্যাসেট’-এর কার্যক্রমও সামনে আসে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি দুবাইয়ের ভার্চুয়াল সম্পদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়।
বাংলাদেশি ব্যবহারকারীরা অ্যাপটিতে নিবন্ধন করে পিয়ার-টু-পিয়ার বাজার ব্যবহার করতে পারেন। স্থানীয় ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে তারা টেথার কিনতে পারেন এবং পরে সেই অর্থ দিয়ে বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করতে পারেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে জানিয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
কখনো এককালীন পাসওয়ার্ড বা ওটিপি সংগ্রহের মাধ্যমে, আবার কখনো টাকা ফেরত দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে।
এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা, হজের অর্থ কিংবা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার নাম করেও মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণ মানুষকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট গ্রাহককেই বহন করতে হবে বলে সতর্ক করেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, আর্থিক সমস্যায় থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এবং সাইবার অপরাধ সম্পর্কে কম জানা ব্যক্তিরাই এসব অবৈধ অ্যাপের প্রধান লক্ষ্য।
তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রতারণা এবং অবৈধ ওয়েবসাইট ও অ্যাপ সম্পর্কে আরও ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সক্রিয়ভাবে এসব প্রতারণা শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আর্থিক গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিষয় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেখে। অন্যদিকে অপরাধমূলক তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার।
ব্যাংক জড়িত থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। এছাড়া পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।তবে প্রতিটি লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। ফলে কিছু সন্দেহজনক লেনদেন নজর এড়িয়ে যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
অনলাইন জুয়া, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বাজি এবং ডিজিটাল জুয়ার নেটওয়ার্ক ঠেকাতে সরকার সম্প্রতি নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন করেছে। এর মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইনটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
নতুন আইনে প্রচলিত জুয়ার পাশাপাশি অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, ক্রীড়া বাজি, সরাসরি বাজি, ক্যাসিনো বাজি, ভার্চুয়াল বাজি, ফ্যান্টাসি বাজি এবং ই-স্পোর্টস বাজিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ডিজিটাল গেম বা প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা এবং জুয়ার কাজে ডিজিটাল ওয়ালেট, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও সার্ভার ব্যবহারও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
এসব অপরাধে ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও জুয়া, বাজি, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সংস্থাটির প্রধান ইকতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন জানিয়েছেন, গত মাসে জুয়া, বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ২০ হাজারের বেশি মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাব শনাক্ত করে বন্ধ করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ও সহায়তা কেন্দ্রের দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪ হাজার সাধারণ ডায়েরি এবং ২৫০টির বেশি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
অনলাইন ঋণ বা বিনিয়োগের প্রস্তাব যত আকর্ষণীয়ই হোক, যাচাই ছাড়া টাকা পাঠানো বিপজ্জনক। বিশেষ করে ঋণ দেওয়ার আগে আবেদন ফি, জামানত, অনুমোদন ফি কিংবা অন্য কোনো অগ্রিম অর্থ চাওয়া হলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক হিসাবের তথ্য বা এককালীন পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কারণ কয়েক মিনিটের অসতর্কতায় হারিয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর ধরে জমানো অর্থ—আর সেই ক্ষতি পূরণ করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

