নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির চিত্র একরৈখিক ছিল না। কোথাও স্বস্তির খবর এসেছে, আবার কোথাও পুরোনো সংকট নতুন রূপে সামনে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, প্রবাসী আয় শক্তিশালী হয়েছে, জুলাইয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিলেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
কিন্তু অর্থনীতির ভেতরের চিত্র আরও জটিল। বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো প্রত্যাশিত গতি নেই, কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি, শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি সংকট বাধা হয়ে আছে এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি।
ফলে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনীতিকে শুধু ভালো বা খারাপ—কোনো একটি শব্দে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং বলা যায়, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু ভিত্তি তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই স্থিতিশীলতাকে উৎপাদন, বিনিয়োগ, আয় ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার কাজ এখনো বাকি।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় ছিল বহুমুখী চাপ
সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্যে ছিল। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ডলার ও ঋণপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল বড় উদ্বেগের জায়গা।
ছয় মাস পর এসব সমস্যার সবকটির সমাধান হয়নি। তবে কিছু সূচকে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক খাতের অবস্থান আগের তুলনায় স্বস্তিদায়ক হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বস্তি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাইয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি
জুলাইয়ের ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। সামগ্রিক সূচক ৫২ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে উঠেছে। সাধারণভাবে ৫০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে উৎপাদন খাতে। এ খাতের সূচক ১৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬৫ দশমিক ৪ হয়েছে। কৃষি ও সেবা খাতেও সম্প্রসারণ দেখা গেছে।
এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একটি মাসের ভালো সূচককে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। উৎপাদনের গতি যদি নতুন বিনিয়োগ, কারখানা সম্প্রসারণ, শ্রমিক নিয়োগ এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই এর বাস্তব সুফল বোঝা যাবে।
উৎপাদনের সূচক ভালো, কিন্তু কারখানায় জ্বালানির চাপ
জুলাইয়ে উৎপাদন খাতের বিভিন্ন উপসূচকেও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন ক্রয়াদেশ, রফতানি আদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়, আমদানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক কারখানায় দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। অর্থনীতিতে চাহিদা ফিরলেও উৎপাদনের অবকাঠামোগত বাধা দূর না হলে সেই চাহিদা পূর্ণাঙ্গ প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেবে না। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তাই শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
রফতানিতে বড় অঙ্ক, কিন্তু প্রবৃদ্ধি দুর্বল
জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৪৭২ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। গত ১২ মাসের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ মাসিক রফতানি আয়। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি হয়েছিল ৪৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এবার প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
এখানেই রফতানি খাতের বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট। মোট আয় বড় হলেও প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী নয়।
ভবিষ্যৎ রফতানি আদেশের ক্ষেত্রেও সতর্কতার কারণ আছে। পোশাক খাতের নতুন রফতানি আদেশ জুলাইয়ে প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে পারছে না। ফলে দ্রুত পণ্য পাঠাতে আকাশপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে আগ্রহী নন।
ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্য একই থাকছে। এতে উদ্যোক্তাদের মুনাফার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
আরও বড় ঝুঁকি হলো ক্রেতা হারানো। কোনো ক্রেতা সময়মতো পণ্য না পেয়ে বিকল্প দেশ থেকে কেনাকাটা শুরু করলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
তারপরও জুলাইয়ের ৪৭২ কোটি ডলারের রফতানি আয় দেখাচ্ছে, সক্ষমতা এখনো রয়েছে। প্রয়োজন উৎপাদনের বাধাগুলো দ্রুত কমানো।
আমদানি বেড়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সংকেত দুর্বল
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে। কিন্তু আমদানির কোন খাতে কতটা পরিবর্তন হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে।
এটি বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়া সাধারণত নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা পুরোনো কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। বিপরীতে এই আমদানি কমে যাওয়া বোঝায় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো সতর্ক।
ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি আমদানি বাড়া বর্তমান চাহিদা মেটায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্পের কাঁচামালে বিনিয়োগ।
বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন
জুন শেষে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ১৯৯৩ সালের পর এটি সর্বনিম্ন। গত বছরের জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণপ্রবৃদ্ধি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
এটি অর্থনীতির জন্য বড় বার্তা বহন করে।
ব্যবসায়ীরা যখন নতুন কারখানা করেন, ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন কিংবা উৎপাদন বাড়ান, তখন সাধারণত ব্যাংক ঋণের চাহিদাও বাড়ে। ঋণপ্রবৃদ্ধির এই দুর্বলতা বোঝাচ্ছে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
এদিকে খেলাপি ঋণের চাপের কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দেখাচ্ছে। ফলে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই জায়গাতেই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ আছে, আস্থার সংকটও আছে
ব্যাংক খাত এখনো অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বল জায়গাগুলোর একটি।
মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনও করা হয়েছে।
তবে শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গ্রাহক যদি নিজের জমা টাকা প্রয়োজনের সময় তুলতে না পারেন, তাহলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইসলামী ব্যাংক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কিংবা ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন বা স্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সীমানায় আটকে থাকে না। এর প্রভাব সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর পড়ে।
ব্যাংক সংস্কারের জন্য তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সম্পদের বাস্তব মূল্যায়ন এবং ঋণ অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু বাজারের চাপ শেষ হয়নি
জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুনে তা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মূল্যস্ফীতি ৮৪ ভিত্তি পয়েন্ট কমেছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি কমার খবর ইতিবাচক হলেও এর অর্থ বাজারে পণ্যের দাম আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়।
এক বছর আগে কোনো পণ্যের দাম ১০০ টাকা হলে জুলাইয়ে সেটি কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা লাগছে। অর্থাৎ দাম বাড়ার গতি কমেছে, কিন্তু আগের বাড়তি দাম রয়ে গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মজুরি। জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এটি মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
ফলে গড় হিসাবে মানুষের আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে সামান্য বেশি গতিতে বাড়ছে। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় স্বস্তি এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে সবচেয়ে বড় স্বস্তি
গত ছয় মাসে অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা বৈদেশিক খাত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রবাসী আয়ের এই শক্তিশালী প্রবাহ রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছে।
১২ আগস্ট দিন শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
রিজার্ভ বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ে, বৈদেশিক ঋণ ও দায় পরিশোধ সহজ হয় এবং ডলার বাজারে আস্থা তৈরি হয়। তবে এটিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
বাণিজ্য ঘাটতি সামলাতে বড় ভরসা প্রবাসী আয়
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয় প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে আমদানি বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে।
এই চাপ মোকাবিলায় রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি অর্থনীতি শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ, শিল্প বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো—প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রার স্বস্তি দেশের ভেতরের বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী করতে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে।
ডলার বাজারে চাপ পুরোপুরি কাটেনি
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়লেও ডলারের দৈনন্দিন চাহিদা এখনো বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
আমদানি, জ্বালানি কেনা, সরকারি ব্যয় এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধে বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে দেশে যত বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, তার বড় অংশ আবার বিভিন্ন পরিশোধে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এ কারণে রিজার্ভ বাড়লেও বাজারে স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত ডলার জমছে না।
কর্মসংস্থান না বাড়লে পুনরুদ্ধার অসম্পূর্ণ
অর্থনীতির সাফল্যের সবচেয়ে বাস্তব মাপকাঠি চাকরি ও আয়।
রিজার্ভ বাড়া, সূচক উন্নত হওয়া কিংবা রফতানি আয় বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাধারণ মানুষ তখনই অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল অনুভব করেন, যখন নতুন কাজ তৈরি হয়, মজুরি বাড়ে এবং সংসারের ব্যয় সামলে সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পকারখানা চালুর খবরের তুলনায় কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ব্যবসা সংকুচিত হওয়া কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর বেশি আলোচনায় এসেছে।
গ্যাস সংকট, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের চাপ, উচ্চ সুদ ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বহু প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেছে।
তাই অর্থনীতির পরবর্তী পর্যায়ের সবচেয়ে বড় কাজ হবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা।
নির্মাণ খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস
জুলাইয়ে নির্মাণ খাতের ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৩। জুনের তুলনায় এটি ৯ দশমিক ১ পয়েন্ট উন্নত হয়েছে।
যদিও সূচক এখনো ৫০-এর নিচে, অর্থাৎ খাতটি সংকোচনের মধ্যে রয়েছে, তবু এক মাসে এত বড় উন্নতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
নির্মাণ খাতের গুরুত্ব শুধু ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। আবাসন, ইস্পাত, সিমেন্ট, পরিবহন, প্রকৌশল এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান এই খাতের সঙ্গে জড়িত।
তাই নির্মাণ খাত পুনরুদ্ধার হলে অর্থনীতির আরও কয়েকটি খাতে একযোগে গতি আসতে পারে।
বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা
একজন উদ্যোক্তা শুধু ঋণের সুদের হার দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি একই সঙ্গে দেখেন কারখানায় গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, বিদ্যুৎ থাকবে কি না, কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি হবে কি না, বিনিময় হার কতটা স্থিতিশীল, বাজারে পণ্যের চাহিদা আছে কি না এবং ভবিষ্যৎ নীতি কতটা অনুমানযোগ্য।
এই জায়গায় ব্যবসায়িক আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। সরকার উৎপাদনমুখী খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের উদ্যোগও নিয়েছে।
কিন্তু অর্থের জোগানই যথেষ্ট নয়।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, দ্রুত আমদানি ও ঋণপত্র সুবিধা, স্থিতিশীল বিনিময় হার, সহজ করব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা একসঙ্গে দিতে পারলে বিনিয়োগে গতি বাড়ার সম্ভাবনা বেশি।
জ্বালানি সংকট কেন পুরো অর্থনীতির সমস্যা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং সংস্কারের ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে দেখেছেন।
তার মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, সুশাসন ও তদারকি জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণ মোকাবিলার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি রাজস্ব খাতেও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার বিশ্লেষণে বর্তমানে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ।
কারণ গ্যাস বা বিদ্যুতের অভাবে একটি কারখানার উৎপাদন কমলে শুধু কারখানা মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। শ্রমিকের আয় কমে, ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বাড়ে, রফতানি কমে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে এবং সরকারের রাজস্বেও প্রভাব পড়ে।
এ কারণেই জ্বালানি নিরাপত্তাকে আলাদা একটি খাতের সমস্যা না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ছয় মাসে কোথায় এগিয়েছে অর্থনীতি
গত ১৮০ দিনের হিসাব করলে কয়েকটি ইতিবাচক বিষয় স্পষ্ট।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। প্রবাসী আয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাইয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সংকেত পাওয়া গেছে। উৎপাদন খাতের সূচকও শক্তিশালীভাবে বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতিও জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে।
এসব পরিবর্তন অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করছে।
কোথায় এখনো বড় দুর্বলতা
অন্যদিকে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে।
নির্মাণ খাত এখনো সংকোচনে। শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্যের চাপ আছে। নতুন কর্মসংস্থানেও প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
আর জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনো চাপের মধ্যে।
তাহলে অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়িয়েছে?
সব তথ্য একসঙ্গে বিচার করলে উত্তর হবে—পুরোপুরি নয়।
তবে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ অর্থনীতিকে বৈদেশিক দিক থেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির গতি কমেছে। জুলাইয়ের উৎপাদন সূচকও আশাব্যঞ্জক।
কিন্তু একটি অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে কি না তা বোঝার জন্য আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
নতুন কারখানা কতটি হচ্ছে? বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে? নতুন চাকরি কত তৈরি হচ্ছে? শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ মিলছে কি না? রফতানি আদেশ বাড়ছে কি না? মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়।
আগামী ছয় মাসই বড় পরীক্ষা
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য যদি হয় বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা, তাহলে আগামী সময়ের সবচেয়ে বড় কাজ হবে সেই স্থিতিশীলতাকে দেশের ভেতরের উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া।
ব্যাংক সংস্কারে পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
কারণ একটি কারখানা সচল থাকা মানে শুধু উৎপাদন নয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের চাকরি, ব্যাংকের ঋণ, রফতানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সরকারের রাজস্ব—সবকিছু জড়িত।
১৮০ দিনের অর্থনৈতিক হিসাব তাই মিশ্র।
একদিকে রেমিট্যান্স, রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি ও জুলাইয়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আশার জায়গা তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি সংকট এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।
অর্থনীতির চাকা থেমে নেই। বরং গতি ফেরার কিছু সংকেত স্পষ্ট হয়েছে। এখন আসল পরীক্ষা হলো সেই সংকেতকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য শুধু রিজার্ভ কত বিলিয়ন ডলার বাড়ল কিংবা কোনো সূচক কত পয়েন্ট উঠল, তা দিয়ে বিচার হবে না। সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কতটা সামলানো যাচ্ছে, নতুন চাকরি হচ্ছে কি না, আয় বাড়ছে কি না এবং জীবনযাত্রা কতটা সহজ হচ্ছে—অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে এসব প্রশ্নের উত্তরেই।

