বিশেষ বিশ্লেষণ
তিনশ বছর আগে ঢাকার মসলিন এমন এক কাপড় ছিল, যা একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে গলিয়ে দেওয়া যেত। সেই মসলিনের উত্তরসূরি জামদানি আজও বাঙালি নারীর প্রিয়, ইউনেস্কো একে মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। অথচ এই ঐতিহ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটা অস্বস্তিকর সত্য; যে শিল্প একসময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাপড় বুনত, সেই শিল্পই আজ টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করছে। গত বছর যখন ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করে ফেলল, তখন বাংলাদেশ জুড়ে ক্ষোভ তৈরি হলো ঠিকই, কিন্তু আসল প্রশ্নটা রয়ে গেল আড়ালে; আমরা কি সময়মতো নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নিয়েছিলাম? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ইতিহাস কি আবার নিজেকে ফিরিয়ে আনছে?
যে কাপড় একদিন ইউরোপকে মুগ্ধ করেছিল
বাংলার তাঁত শিল্পের বয়স হাজার বছরের কম নয়। সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এবং তেরো শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁদের ভ্রমণকাহিনিতে বাংলার বস্ত্র ও তাঁত শিল্পের কথা লিখে গেছেন। মুঘল আমলে ঢাকা যখন বাংলার রাজধানী, তখন ঢাকাই মসলিন পৌঁছে গিয়েছিল ইউরোপের রাজদরবার পর্যন্ত। ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের হিসাব বলছে, ১৭৮৭ সালে ঢাকা থেকে ইংল্যান্ডে যে পরিমাণ মসলিন রপ্তানি হয়েছিল, তার মূল্য ছিল প্রায় ৩০ লাখ টাকা; আজকের হিসাবে যা বিশাল অঙ্ক। অথচ মাত্র তিন দশকের মধ্যে, ১৮১৭ সালের মধ্যেই সেই রপ্তানি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। একটা শিল্প যা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল, তা তিরিশ বছরে কীভাবে মুছে গেল, এই প্রশ্নটাই আজকের তাঁত শিল্পকে বোঝার আসল চাবিকাঠি।
পতনের পেছনে যে যুক্তি কাজ করেছিল
পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করে, ফলে ইউরোপের অন্য বণিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং তাঁতিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করেন। মসলিনের প্রাণ ছিল ‘ফুটি কার্পাস’ নামের বিশেষ তুলা, যা জোর করে চাষ বন্ধ করিয়ে নীলচাষে বাধ্য করা হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। কিন্তু এই শিল্পের চূড়ান্ত পতনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব। বাষ্পশক্তিচালিত যন্ত্রে ইংল্যান্ডের কারখানাগুলো যখন ব্যাপক পরিমাণে সস্তা কাপড় তৈরি শুরু করল, তখন হাতে বোনা দামি মসলিনের পক্ষে সেই দামের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া সম্ভব ছিল না। এখানে অর্থনীতির একেবারে মৌলিক একটা নিয়ম কাজ করেছে; যখন যন্ত্র বড় আকারে উৎপাদন করে খরচ কমিয়ে ফেলে, তখন হাতে তৈরি পণ্য দামের প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ে। এই একই নিয়ম আজও কাজ করছে, শুধু প্রতিপক্ষ বদলে গেছে; বাষ্পচালিত যন্ত্রের জায়গায় এসেছে পাওয়ারলুম আর চিত্তরঞ্জন লুম।
আজকের তাঁত: সংখ্যায় বড়, বাস্তবে ভঙ্গুর
স্বাধীন বাংলাদেশে হস্তচালিত তাঁত শিল্প আজও দেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্ষেত্র। এক জাতীয় জরিপ অনুযায়ী দেশে চালু তাঁতের সংখ্যা প্রায় এক লাখ একানব্বই হাজার, আর বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁতের সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার; অর্থাৎ প্রতি তিনটি তাঁতের একটির বেশি ইতিমধ্যে বন্ধ। শুধু হস্তচালিত তাঁত থেকেই বছরে প্রায় ৭০ কোটি মিটার কাপড় উৎপাদিত হয় বলে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প-সংক্রান্ত তথ্যে উঠে এসেছে। জামদানি ২০১৩ সালে ইউনেস্কোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় ঠাঁই পায়, আর ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পায়। কাগজে-কলমে এই শিল্পের গুরুত্ব তাই স্পষ্ট। কিন্তু সংখ্যার এই বড় চেহারার আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, সেটা অনেক বেশি জটিল; তুলনা করলে দেখা যায়, একই সময়ে দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত একাই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ (২০২১-২২ অর্থবছরের হিসাবে) নিয়ে আসছে, যেখানে তাঁত শিল্প এখনো মূলত অভ্যন্তরীণ বাজার আর কুটির অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
সুতার দামেই লুকানো আছে সংকটের বীজ
তাঁতিদের সঙ্গে কথা বললে যে অভিযোগটা বারবার উঠে আসে, তা হলো সুতার দাম। একবছরের ব্যবধানে সুতার দাম একশ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার তথ্য শিল্প-সংশ্লিষ্টরাই জানিয়েছেন, আর করোনা মহামারির ধাক্কা এবং দক্ষ কারিগরের অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। সুতার দাম বাড়ায় শাড়ির দাম বেড়েছে, ক্রেতা কমেছে, আর সেই ফাঁক গলে বাজার দখল করেছে কম খরচে উৎপাদিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন লুমের কাপড়, যা দেখতে প্রায় একই রকম কিন্তু দামে সস্তা। যশোরের তাঁতপল্লি থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত একই চিত্র। নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চাইছে না, কারণ পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুবই কম। সরকারও বসে নেই, গত সাত বছরে তাঁতিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে ৫৯ জেলার তাঁতিদের জন্য। কিন্তু গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, এই বিপুল ব্যয়ের পরও তাঁতিদের বাস্তব জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়, সমস্যাটা কি টাকার অভাব, নাকি সঠিক জায়গায় সেই টাকা খরচ না হওয়া?
নিজের ঘর সামলাতে না পারার মাশুল
২০২৪ সালের শুরুতে যখন খবর এলো ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করে ফেলেছে, তখন পুরো টাঙ্গাইল জুড়ে মানববন্ধন আর ক্ষোভের ঝড় ওঠে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্পনকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর নিজেই স্বীকার করেছে, সেই সময় পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বা বিসিকের পক্ষ থেকে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিবন্ধনের জন্য কোনো আবেদনই জমা পড়েনি। আড়াইশ বছরের বেশি ঐতিহ্য বহন করা একটা পণ্য, অথচ তার আইনি সুরক্ষা নিতে আমরা নিজেরাই এগিয়ে যাইনি; এটা নীতিগত দুর্বলতা ছাড়া আর কিছু নয়। মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানের ভিত্তিতে বিচার করলে বিষয়টি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি পর্ষদে বাংলাদেশের পক্ষে যেতে পারে, কিন্তু সেই আইনি লড়াই দীর্ঘ এবং জটিল। আর এই গল্প শুধু বাংলাদেশের একার নয়, সীমান্তের ওপারে ভারতের বেনারসের ঐতিহ্যবাহী তাঁতিরাও একই রকম সংকটে পড়েছেন, বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের কারণে তাদের বেনারসি শাড়ির ব্যবসায়ও ধস নেমেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। অর্থাৎ গোটা উপমহাদেশজুড়েই হাতে বোনা কাপড়ের ঐতিহ্য একসঙ্গে দুই দিক থেকে চাপে; একদিকে যন্ত্রের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনীতির অস্থিরতা।
ইতিহাস থেকে শেখার আসলে কিছু আছে কি
অর্থনীতির একটা প্রমাণিত নীতি হলো, কোনো শিল্প যখন দামের প্রতিযোগিতায় বড় শিল্পের সঙ্গে পেরে ওঠে না, তখন তার টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো নিজেকে আলাদা করে তোলা, অর্থনীতিবিদেরা যাকে বলেন তুলনামূলক সুবিধা বা নিশ মার্কেটে অবস্থান তৈরি করা। মসলিন যন্ত্রের সঙ্গে দামে পেরে ওঠেনি, কারণ তখন সেই ধারণাটাই তৈরি হয়নি। কিন্তু জাপানের ঐতিহ্যবাহী তাঁত বা বয়নশিল্প যেভাবে নিজেদের ‘হাতে তৈরি, অনন্য, সীমিত সংখ্যক’ পণ্য হিসেবে প্রিমিয়াম বাজারে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই মডেল থেকে বাংলাদেশের শেখার আছে অনেক কিছু। জামদানির ইউনেস্কো ও জিআই স্বীকৃতি এই পথের শুরু মাত্র, শেষ নয়। এখন দরকার নকশায় নতুনত্ব, ই-কমার্সের মাধ্যমে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানো, এবং সবচেয়ে জরুরি, নিজেদের প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আইনি মালিকানা সময় থাকতেই নিশ্চিত করা। তাঁতিদের জন্য শুধু ভর্তুকি বা প্রকল্পের টাকা যথেষ্ট নয়, দরকার তাদের পণ্যকে বিশ্ববাজারে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করানোর সুসংগঠিত পরিকল্পনা। ইতিহাস একবার আমাদের শিখিয়েছে, বদলাতে না পারা একটা শিল্পকে কীভাবে মুছে দিতে পারে; প্রশ্ন হলো, সেই শিক্ষা আমরা আসলেই নিয়েছি কি না।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

