বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প চাপে পড়তে পারে। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্য এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় যাওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে যেমন কিছু সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদ্যমান বাজার ধরে রাখা, নতুন বাজার তৈরি করা এবং তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এখন আধুনিক ও কৌশলগত অংশীদারিতে রূপ নিয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাজ্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি জানান।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’-এর আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্তভাবে দেশটির বাজারে রপ্তানি করতে পারছে। এলডিসি উত্তরণের পরও তিন বছর এই সুবিধা বহাল থাকবে। পরবর্তী সময়ে ৯২ শতাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় থাকবে, যার মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
যুক্তরাজ্যের বাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি শেষ হওয়া চার প্রান্তিকে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য ও সেবায় মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের বাজারে বর্তমান সুবিধা ধরে রাখা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় স্বস্তি। তবে ভবিষ্যতে শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যৎ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রস্তুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ও অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৪ সালে ইইউ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশে ইইউর রপ্তানি ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে রপ্তানির পরিমাণ ২১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি হয়েছে বলে ইইউর তথ্য জানিয়েছে। এর ৯০ শতাংশের বেশি ছিল তৈরি পোশাক।
এই বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও বাড়াচ্ছে। কারণ এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, বাংলাদেশের এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বাড়ানো। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মাইলফলক। সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করা গেলে শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকিকে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগে পরিণত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

