বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও খাত দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশের প্রায় ২ হাজার ২০০টি ছোট ও মাঝারি এনজিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।
বিআইডিএসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশেষ করে যেসব এনজিও বিদেশি অনুদানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে না, তাদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। কারণ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলো ঋণ কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় দিয়ে অর্থ সংকট কিছুটা সামাল দিতে পারে, কিন্তু অনুদাননির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন বিকল্প আয়ের উৎস নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে অনুদাননির্ভর এনজিওগুলোর বড় অংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া এমন দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, অর্থ সংকট তাদের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাজেট গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে গড়ে ১২ শতাংশ।
‘বিদেশি নির্ভরতার বাইরে: বাংলাদেশের এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিআইডিএস এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে সরকার, এনজিও এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্ব তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এনজিওগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তাদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
বিআইডিএসের গবেষণা বলছে, উন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত অর্থে ২৩ শতাংশ কমেছে, যা এ ধরনের সহায়তা কমার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন।
তবে বাংলাদেশে এর পুরো প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। কারণ আগে অনুমোদিত অনেক প্রকল্পের অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা বিদেশি অনুদান ছাড় হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশি অনুদানের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৯৫৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। পরে তা ৩১ শতাংশ কমে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৮৩৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল ২ হাজার ৬১টি, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১ হাজার ৬৫৪টি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থ সংকট অব্যাহত থাকলে অনেক এনজিও প্রথমে কর্মী সংখ্যা কমাতে এবং পরে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হতে পারে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় আরও সতর্ক করা হয়েছে, দীর্ঘদিন অর্থ সংকট চললে অনেক এনজিও তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে আয় তৈরির জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো গুরুত্ব হারাতে পারে।
বিআইডিএস মনে করছে, সমাধান শুধু নতুন বিদেশি দাতা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সরকারকে এনজিওগুলোর দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জনসেবা কার্যক্রমে তাদের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজন বুঝতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দিতে এনজিওগুলোর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সেবা কার্যক্রমে এনজিও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয় বিধিমালায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। গবেষণায় যোগ্য এনজিওগুলোর জন্য সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় পরিষ্কার নীতিমালা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহারে সহজ নিয়ম এবং সামাজিক ব্যবসার জন্য বিশেষ সুবিধার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে বিকল্প অর্থায়ন বিদেশি অনুদানের সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে ব্যয় নেমে এসেছে ৩৪৫ কোটি টাকায়। অন্যদিকে সামাজিক ব্যবসা একটি এনজিওর মোট বাজেটের মাত্র ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের এনজিও খাতকে এখন নতুন অর্থায়ন কাঠামোর দিকে যেতে হবে। সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, সামাজিক ব্যবসা এবং স্থানীয় সম্পদের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

