বিশেষ বিশ্লেষণ
ধরুন, সকাল থেকে আপনি কিছু খাননি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এই অবস্থায় কেউ যদি আপনার সামনে এক প্লেট গরম ভাত রাখে, ওই প্লেটটির মূল্য আপনার কাছে অসীম; পঞ্চাশ টাকা তো দূরের কথা, প্রয়োজনে পাঁচশ টাকাও দিয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ। এবার দ্বিতীয় প্লেট এল। ভালো লাগল, কিন্তু প্রথমটির মতো নয়। তৃতীয় প্লেটে আপনি ইতস্তত করছেন। চতুর্থ প্লেট সামনে রাখলে বিরক্ত হবেন। অথচ চালের মান বদলায়নি, রান্না বদলায়নি, দোকানের দামও বদলায়নি। বদলেছেন আপনি। অর্থনীতিতে এই সহজ অভিজ্ঞতার একটি নাম আছে; ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ, ইংরেজিতে যাকে বলে ডিমিনিশিং মার্জিনাল ইউটিলিটি। এবং এই একটিমাত্র সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় হীরার দাম কেন পানির চেয়ে বেশি, বাংলাদেশের মানুষ কেন প্রতি বছর কম ভাত খাচ্ছে, সরকার কেন ১৫ টাকায় চাল বিক্রি করে, এমনকি টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় কি না, সেই বিতর্কও।
প্রথম প্লেটটাকে এত দামি বানাল কে
পার্থক্যটা বুঝতে দুটি শব্দ আলাদা করে নেওয়া দরকার; মোট উপযোগ আর প্রান্তিক উপযোগ। মোট উপযোগ হলো সব প্লেট মিলিয়ে পাওয়া মোট তৃপ্তি; প্রান্তিক উপযোগ হলো ঠিক পরের একটি অতিরিক্ত প্লেট থেকে পাওয়া বাড়তি তৃপ্তি। খেয়াল করুন, চার প্লেট খেলে আপনার মোট তৃপ্তি এক প্লেটের চেয়ে বেশিই, মোট উপযোগ কমছে না। কমছে বৃদ্ধির হার। প্রথম প্লেট হয়তো ১০০ একক তৃপ্তি দিল, দ্বিতীয়টি ৬০, তৃতীয়টি ২৫, চতুর্থটি ৫। পঞ্চম প্লেটে সেটি শূন্য ছুঁয়ে ঋণাত্মক হয়ে যেতে পারে। তখন খাবারটাই অস্বস্তির কারণ। এই বিন্দুটিকে বলা হয় তৃপ্তিসীমা। মূল কথাটি হলো, একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় তার মোট উপযোগ দিয়ে নয়, শেষ বা প্রান্তিক এককটির উপযোগ দিয়ে।
সূত্রটি কারও ব্যক্তিগত মতামত নয়, দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে পরীক্ষিত। জার্মান অর্থনীতিবিদ হারমান হাইনরিখ গোসেন ১৮৫৪ সালে তাঁর বই ‘দ্য লজ অব হিউম্যান রিলেশনস’-এ প্রথম এটি পূর্ণাঙ্গভাবে হাজির করেন, যা আজ ‘গোসেনের প্রথম সূত্র’ নামে পরিচিত; তারও আগে ১৭৩৮ সালে ঝুঁকি পরিমাপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ড্যানিয়েল বার্নুলি ধারণাটির বীজ বপন করেছিলেন। গোসেনের প্রথম সূত্র বলছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যতটুকু পরিসর, তার মধ্যে প্রান্তিক উপযোগ কমতেই থাকে। মজার ব্যাপার কী জানেন? বইটি প্রকাশের সময় জার্মানিতে প্রায় কেউ পাত্তা দেয়নি, কিন্তু পরে ইংরেজ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম স্ট্যানলি জেভন্স স্বীকার করে নেন যে অর্থনীতির সাধারণ নীতি ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে গোসেন তাঁকে পুরোপুরি ছাড়িয়ে গেছেন, এবং মৌলিক তত্ত্বে গোসেনের বিশ্লেষণ তাঁর নিজের চেয়েও বেশি ব্যাপক ও গভীর। আধুনিক আচরণগত অর্থনীতিতেও এটি টিকে আছে; এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে অর্থনীতিতে একে সরাসরি ‘সূত্র’ বলা হয়, এবং বেশির ভাগ উপযোগ-রেখার অবতল আকৃতিতে এর ছাপ থাকে।
পানি কেন সস্তা, হীরা কেন দামি
এই সূত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত পরীক্ষাটি নিয়েছিলেন অ্যাডাম স্মিথ নিজে, আজ থেকে আড়াইশ বছর আগে। ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’-এর প্রথম খণ্ডের চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি লিখেছিলেন, যেসব জিনিসের ব্যবহারিক মূল্য সবচেয়ে বেশি, বিনিময়মূল্যে সেগুলো প্রায়ই সবচেয়ে কম দামি (যেমন পানি)। পানির চেয়ে উপকারী কিছু নেই, অথচ তা দিয়ে কিছুই কেনা যায় না; আর হীরার ব্যবহারিক মূল্য নগণ্য হলেও তার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য পাওয়া যায়। স্মিথ সমস্যাটা চিহ্নিত করেছিলেন, সমাধান দিতে পারেননি। সমাধান এল প্রান্তিক উপযোগের হাত ধরে: পানির সরবরাহ যত বাড়ে, প্রতিটি অতিরিক্ত একক পানির মূল্য মানুষের কাছে তত কমে; হীরা দুষ্প্রাপ্য বলে একটি বাড়তি হীরার উপযোগ একটি বাড়তি গ্লাস পানির চেয়ে বেশি। কিন্তু মরুভূমিতে তৃষ্ণায় মরতে বসা মানুষের কাছে হিসাবটা উল্টে যায়, সে হীরার চেয়ে পানির জন্যই বেশি দিতে রাজি হবে।
এখানেই আমার প্রথম পর্যবেক্ষণ। ‘প্রথম প্লেট ভাতের দাম বেশি’ কথাটি আসলে ভুলভাবে বলা হয়। বাজারে ভাতের দাম একটাই; প্লেট-ভেদে বদলায় না। যা বদলায় তা হলো ওই প্লেটের জন্য আপনার ‘সর্বোচ্চ দিতে ইচ্ছুক মূল্য’। প্রথম প্লেটে আপনি যা দিতে রাজি ছিলেন আর যা আসলে দিলেন, এই ব্যবধানটিকেই অর্থনীতিতে বলে ভোক্তা-উদ্বৃত্ত বা কনজিউমার সারপ্লাস। খিদের সময় প্রথম প্লেটে এই উদ্বৃত্ত বিশাল, চতুর্থ প্লেটে প্রায় শূন্য। সস্তা হোটেলের ‘আনলিমিটেড ভাত’ ব্যবসাটা এই সূত্রের ওপরই দাঁড়িয়ে। মালিক জানেন, বিনা মূল্যে দিলেও আপনি তিন প্লেটের বেশি খাবেন না, কারণ চতুর্থ প্লেট আপনার কাছে আর কোনো মূল্যই তৈরি করে না।
বাংলাদেশিরা ভাত কমাচ্ছে, কারণটা দারিদ্র্য নয়
তত্ত্ব পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের একটি দেশে এই সূত্র কি সত্যিই মাপা যায়? যায়, এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ সেই মাপটাই দিয়ে রেখেছে। ২০০০ সালে একজন বাংলাদেশি দিনে গড়ে ৪৫৯ গ্রাম চাল খেতেন, ২০০৫ সালে ৪৪০ গ্রাম, ২০১০ সালে ৪১৬ গ্রাম, ২০১৬ সালে ৩৬৭ গ্রাম, আর এরপর তা তীব্রভাবে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩২৮ গ্রামে। ২০১৬ থেকে ২০২২; এই ছয় বছরেই মাথাপিছু দৈনিক চাল খাওয়া ১০ শতাংশ কমে ৩২৮.৯ গ্রামে নেমেছে, এবং জরিপের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর কারণ আয় বৃদ্ধি, যা মানুষকে ভাতের বাইরের খাবার কিনতে সক্ষম করেছে।
এই একটি বাক্যে গোসেনের সূত্রটি ধরা পড়ে গেছে। আয় বাড়লে মানুষ ভাত ছাড়ে না, ভাতের প্রান্তিক প্লেটটি ছাড়ে, কারণ ওই বাড়তি টাকাটা দিয়ে এক টুকরা মাছ কিনলে তৃপ্তি বেশি। সংখ্যাতেও তাই: ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দৈনিক মাথাপিছু সবজি খাওয়া ১৫৭ গ্রাম থেকে বেড়ে ২০১.৯২ গ্রাম হয়েছে, মাছ ৪২.১ গ্রাম থেকে বেড়ে ৬৭.৮৩ গ্রাম’ ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। ফলে ভাত আর সবজির ব্যবধান নাটকীয়ভাবে কমেছে: ২০০৫ সালে বাংলাদেশিরা সবজির তুলনায় ২.৮ গুণ বেশি ভাত খেতেন, ২০২২ সালে সেই অনুপাত নেমেছে ১.৬ গুণে। সব মিলিয়ে ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, দুধ ও ফলের দৈনিক মাথাপিছু ভোগ ২০১৬ সালের ৭৩৪.৭ গ্রাম থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৮২০.৮ গ্রামে পৌঁছেছে, আর গড় ক্যালরি গ্রহণ ৮.২৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দিনে ২,৩৯৩ কিলোক্যালরিতে।
এটিকে অর্থনীতিতে বলা হয় এঙ্গেলের সূত্র, উনিশ শতকে জার্মান পরিসংখ্যানবিদ আর্নস্ট এঙ্গেল দেখিয়েছিলেন, আয় বাড়লে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে খাদ্যের অংশ কমে, যদিও খাদ্যে মোট টাকা খরচ বাড়তেই থাকে। গোসেনের সূত্রেরই এটি পারিবারিক বাজেট-সংস্করণ। বাংলাদেশের তথ্য এখানেও মিলে যায়: মোট ভোগব্যয়ে খাদ্যের অংশ ২০০৫ সালে ছিল ৫৩.৮১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৪৭.৭০ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪৫.৭৬ শতাংশ।
যে জায়গায় সূত্রটি আর স্বস্তির খবর দেয় না
কিন্তু এখানেই গল্পটা শেষ নয়, এবং এই জায়গাতেই আমার দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। উপরের সংখ্যাগুলো পড়লে মনে হয় দেশ দ্রুত এগোচ্ছে। একটু গভীরে গেলে ছবিটা আলাদা। জরিপ অনুযায়ী পরিবারের গড় মাসিক আয় ২০১০ সালের ১১,৪৭৯ টাকা থেকে ২০১৬ সালে ১৫,৯৮৮ টাকা এবং ২০২২ সালে ৩২,৪২২ টাকায় পৌঁছেছে; মোট মাসিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩১,৫০০ টাকা। একই সময়ে খাদ্যে পরিবারপ্রতি মাসিক ব্যয় ২০১৬ সালের ৭,৩৫৪ টাকা থেকে বেড়ে ২০২২ সালে হয়েছে ১৪,০০৩ টাকা। লক্ষ করুন, আয় ছয় বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, খাদ্যব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কিন্তু খাদ্যের অংশ কমেছে মাত্র ২ শতাংশ বিন্দুর মতো। অথচ এঙ্গেলের সূত্র অনুযায়ী আয় দ্বিগুণ হলে খাদ্যের অংশ এর চেয়ে অনেক বেশি কমার কথা।
কারণটা কঠিন নয়, ওই আয়বৃদ্ধির বড় অংশটাই নামমাত্র, দাম বাড়ার কারণে খেয়ে ফেলেছে মূল্যস্ফীতি। সানেমের বিশ্লেষণও একই ইঙ্গিত দেয়: খাদ্য, বাসস্থান ও সেবার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেশি থাকায় আয়বৃদ্ধির বড় অংশ মৌলিক চাহিদাতেই চলে যাচ্ছে, সঞ্চয় বা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। চাপটা এখনো আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে ২০২৬ সালের আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩২ শতাংশ। এখান থেকে যে সিদ্ধান্তটি টানা যায় তা হলো: প্রান্তিক উপযোগের সূত্র বাস্তব আয়ের ওপর কাজ করে, নামমাত্র আয়ের ওপর নয়। বেতন দ্বিগুণ হলে আপনি দ্বিতীয় প্লেট ভাত ছেড়ে মাছের দিকে যাবেন, কিন্তু একই সময়ে মাছের দামও দ্বিগুণ হলে আপনি প্লেটেই আটকে থাকবেন। বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার গত কয়েক বছর ঠিক এই ফাঁদেই ছিল।
সরকার যখন একই অঙ্কটাই কষে
এই সূত্র কেবল পাঠ্যবইয়ের জিনিস নয়, রাষ্ট্রের ভর্তুকি নীতিও এর ওপরই দাঁড়ানো। এক কেজি চালের ওপর ভর্তুকি দিলে সেটি কার হাতে গেলে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে? প্রান্তিক উপযোগের উত্তর পরিষ্কার: যার ভান্ডার যত খালি, তার কাছে বাড়তি এককটির মূল্য তত বেশি। ধনী পরিবারের কাছে এক কেজি বিনা মূল্যের চালের মূল্য প্রায় শূন্য; দিনমজুরের পরিবারে সেটাই সেদিনের রাতের খাবার। বাংলাদেশের কর্মসূচিগুলো এই যুক্তিতেই সাজানো। গত ১ আগস্ট থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৪৯৫টি উপজেলার ৫৫ লাখ কার্ডধারী পরিবার ছয় মাস, আগস্ট থেকে নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল; প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাচ্ছেন ১৫ টাকা কেজি দরে। পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ১০৮টি কেন্দ্র; দোকান ও ট্রাক; থেকে খোলাবাজারে বিক্রয় বা ওএমএস কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত চাল ও আটা বিক্রি চলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই দুই কর্মসূচি মিলিয়ে সরকার ১৫ লাখ ২ হাজার ৩৯৩ টন চাল বিতরণ করেছে, আর ওএমএসে বর্তমান দর প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও খোলা আটা ২৪ টাকা।
এখানে একটা প্রশ্ন করি, মাসে ৩০ কেজির সীমাটা কি নিছক বাজেটের হিসাব? আমার পর্যবেক্ষণ, না। এর পেছনে গোসেনের দ্বিতীয় সূত্রটি কাজ করছে। গোসেনের দ্বিতীয় সূত্র বলে, একজন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যয় এমনভাবে ভাগ করবেন যেন প্রতিটি পণ্য বা সেবার প্রান্তিক উপযোগ ও দামের অনুপাত সব খাতে সমান হয়। নীতিনির্ধারণে এর অনুবাদ হলো, একই পরিবারকে ৬০ কেজি দেওয়ার চেয়ে দুটি পরিবারকে ৩০ কেজি করে দিলে মোট সামাজিক উপযোগ বেশি, কারণ প্রথম পরিবারের ৩১তম কেজির উপযোগ দ্বিতীয় পরিবারের প্রথম কেজির চেয়ে কম। পাঁচ সদস্যের পরিবারে মাসে ৩০ কেজি চাল মানে দৈনিক মাথাপিছু প্রায় ২০০ গ্রাম; জাতীয় গড় ৩২৯ গ্রামের বেশ নিচে, অর্থাৎ ভর্তুকিটি চাহিদার সবচেয়ে জরুরি অংশটুকু ছুঁয়ে থেমে যাচ্ছে, বাকিটা বাজারের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। এটি অপচয় ঠেকানোর পাঠ্যপুস্তকীয় নকশা। একই কারণে সব নাগরিকের জন্য ঢালাও চাল-ভর্তুকি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নীতি; টাকা খরচ হয় বেশি, উপযোগ তৈরি হয় কম।
তাহলে সূত্রটি কোথায় ভাঙে
নিরপেক্ষ থাকতে হলে সূত্রের সীমাটুকুও বলা দরকার, কারণ এটি নিঃশর্ত নয়। প্রথমত, এটি কাজ করে কিছু শর্তে, এককগুলো একই মানের হতে হবে, ভোগ চলতে হবে অল্প সময়ের ব্যবধানে (আজ এক প্লেট আর আগামী সপ্তাহে আরেক প্লেট হলে হিসাব খাটে না), এবং এর মধ্যে রুচি বা আয় বদলানো চলবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যতিক্রম আছে; নেশাদ্রব্য বা সংগ্রহের শখের ক্ষেত্রে পরের এককটি আগেরটির চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। তৃতীয়ত, বিশ শতকের গোড়ায় হিকস ও অ্যালেনের নেতৃত্বে ‘অর্ডিনাল বিপ্লব’ যুক্তি দিয়েছিল, তৃপ্তিকে সংখ্যায় মাপা যায় না বলে উপযোগের একক ধরে হিসাব করাই ত্রুটিপূর্ণ; তাঁরা নিরপেক্ষতা-রেখা দিয়ে একই আচরণ ব্যাখ্যা করেন। তবে লক্ষণীয়, তাঁদের বিকল্প মডেলটিও শেষ পর্যন্ত একই আচরণগত ধারণার ওপর দাঁড়ানো, বাড়তি একক থেকে বাড়তি সন্তুষ্টি কমে। সূত্রটির ভাষা বদলেছে, ভিত্তি টেকেনি এমন নয়।
টাকার বেলায়ও কি একই নিয়ম
শেষ প্রশ্নটি সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক: ভাতের বেলায় যা সত্য, টাকার বেলায়ও কি তা-ই? এখানে সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে চমকপ্রদ গবেষণা-নাটকটি ঘটেছে। ২০১০ সালে ড্যানিয়েল কানেমান ও অ্যাঙ্গাস ডিটন দেখিয়েছিলেন, বার্ষিক ৭৫ হাজার ডলার আয়ের পর সুখ আর বাড়ে না; ২০২১ সালে ম্যাথু কিলিংসওয়ার্থ উল্টো ফল পান; ওই সীমার ওপরেও সুখের ঢাল একই রকম খাড়া। দুই পক্ষ দশ বছর ধরে ঝগড়া না করে যা করলেন, সেটিই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য: ২০২৩ সালে কানেমান, কিলিংসওয়ার্থ ও বারবারা মেলার্স একসঙ্গে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী সহযোগিতা’য় বসে দুজনের কাঁচা তথ্য মিলিয়ে দেখেন, আয়ের লগারিদমের সঙ্গে সুখ ধারাবাহিকভাবেই বাড়ে, তবে সবচেয়ে অসুখী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটি সীমার পর তা সমতল হয়ে যায়।
খেয়াল করুন, এই লগারিদমিক ফলটিই আসলে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগের সবচেয়ে কঠোর আধুনিক প্রমাণ। লগারিদমিক সম্পর্কের সহজ অর্থ হলো, সমান পরিমাণ বাড়তি সুখ পেতে হলে আয় সমান টাকায় নয়, সমান গুণিতকে বাড়াতে হবে। মাসে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজারে গেলে জীবনে যে পরিবর্তন আসে, ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজারে তা আসে না; সেই একই অনুভূতি পেতে যেতে হবে ৮০ হাজারে। ২০ হাজার টাকার সেই প্রথম বৃদ্ধিটাই আপনার ‘প্রথম প্লেট ভাত’। আর এখান থেকেই ন্যায্যতার প্রশ্নটি জন্ম নেয়, যা প্রগতিশীল করব্যবস্থার মূল যুক্তি: ধনীর কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত এক হাজার টাকায় তাঁর যতটা ক্ষতি, দরিদ্রের হাতে পৌঁছানো ওই এক হাজার টাকায় লাভ তার চেয়ে অনেক বেশি কারণ দুজনের প্লেট সমানভাবে ভরা নয়।
তাই পরের বার ক্ষুধা পেটে প্রথম গ্রাসটা মুখে তোলার সময় একবার ভাবতে পারেন, ওই মুহূর্তে আপনার হাতে থাকা প্লেটটির মূল্য বাজারদরে লেখা নেই। সেটি লেখা আছে আপনার খালি পেটে। আর অর্থনীতি নামের বিষয়টি, শেষ বিচারে, এই খালি জায়গাগুলোর হিসাব রাখার বিদ্যা ছাড়া আর কিছু নয়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

