“তীর ছাড়া আমার চলেই না”—বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই বিজ্ঞাপনী স্লোগান শুধু একটি প্রচারণা নয়, বরং বহু বছরের পরিচিত একটি অনুভূতি। তীর আটা, ময়দা, সুজি, সয়াবিন তেল—এসব পণ্যের সঙ্গে দেশের অনেক পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে। আর এসব পণ্যের পেছনের প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপও দেশের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়িক নাম।
কিন্তু সম্প্রতি এই পরিচিত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, সিটি গ্রুপের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা প্রায় তিন ডজন ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। দুর্বল মুদ্রার বিনিময় হার, অবকাঠামোগত বিলম্ব এবং দ্রুত সম্প্রসারণের চাপ প্রতিষ্ঠানটিকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ঋণের একটি অংশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। বরং এটি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অর্থায়নের দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতার প্রতিফলন—বড় হওয়ার জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
একটি প্রতিষ্ঠান যখন মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রায় সবসময় ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ঝুঁকির বড় অংশ চলে যায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। আর সেই ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় পারিবারিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যেগুলো চ্যাবল নামে পরিচিত, একসময় বিপুল পরিমাণ ঋণের ওপর নির্ভর করে দ্রুত সম্প্রসারণ করেছিল।
১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে হানবো আয়রন অ্যান্ড স্টিল ধসে পড়ে। এরপর কিয়া সংকটে পড়ে এবং একই বছরের শেষে দেশটির ৩০টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ঋণ ও মূলধনের অনুপাত প্রায় পাঁচ গুণে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ডেউউও বড় সংকটে পড়ে।
অবশ্য বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়া নয়। দুই দেশের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক ব্যবস্থা এক নয়। কিন্তু শিক্ষা একই—যখন বড় ব্যবসা, ব্যাংক এবং সামগ্রিক অর্থনীতি অতিরিক্তভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ সমস্যা শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
দক্ষিণ কোরিয়া পরে ব্যবসায়িক ঋণ কমানো, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, করপোরেট পরিচালনা উন্নত করা এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার দিকে যায়। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ঋণ বন্ধ করা নয়, বরং অর্থ সংগ্রহের বিকল্প পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশ অর্থায়ন আসে ব্যাংক থেকে, যেখানে পুঁজিবাজারের অংশ মাত্র প্রায় ১ শতাংশ।
এটি অর্থায়নের বৈচিত্র্য নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
সাবেক সিটি ব্যাংক এনএ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সেলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদের মতে, এমন পরিস্থিতি একটি ব্যাংক সংকটকে জাতীয় সংকটে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে কোম্পানিগুলো প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি ও অধিকারমূলক শেয়ারের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা। জুন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।
প্রশ্ন হলো, একটি কোম্পানির কারখানা তৈরি করতে যখন হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়, তখন তারা কোথায় যাবে?
সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো ব্যাংক।
ব্যাংক ঋণ দ্রুত পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠান ঋণ নেয়, কারখানা তৈরি করে এবং সুদসহ অর্থ ফেরত দেয়।
অন্যদিকে মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোম্পানিকে নিজের মালিকানার একটি অংশ বিনিয়োগকারীদের দিতে হয়। বিনিয়োগকারীও লাভের অংশ পায় এবং একই সঙ্গে ঝুঁকির অংশীদার হয়।
ঋণপত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিষয় রয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময় পরে সুদসহ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
একটি সুস্থ অর্থনীতিতে এই তিন ধরনের অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক ঋণই প্রায় একমাত্র প্রধান পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন ব্যবসায়ীরা বারবার ঋণের পথ বেছে নেন?
এর প্রধান কারণ হলো সহজলভ্যতা।
ব্যাংক ঋণ তুলনামূলক দ্রুত পাওয়া যায়। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে যেতে হলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর্থিক তথ্য প্রকাশ, নিয়ম মেনে চলা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি অনেক পারিবারিক ব্যবসার কাছে কঠিন মনে হয়।
বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মূলধনকে অর্থায়নের বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে বিবেচনা করে। ভারতে এই হার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের মূলধন সংগ্রহের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান কিছু নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতার কারণে পুঁজিবাজারে যেতে আগ্রহী হয় না। সরকার চাইলে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে এবং ব্যবসার জন্য এটিকে আরও আকর্ষণীয় করতে পারে।
আরেকটি কারণ হলো মালিকানা ধরে রাখার মানসিকতা।
ব্যাংক ঋণ নিলে ব্যবসার মালিকানা ভাগ করতে হয় না। একটি পরিবার পুরো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই অন্যের অর্থ ব্যবহার করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা সেই ঋণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না।
রিটেইলবুকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম চৌধুরীর মতে, অনেক পরিবার মালিকানার অংশ ছাড়তে ভয় পায়, যদিও বাস্তবে একটি কোম্পানির কিছু অংশ বাজারে ছাড়লেও প্রতিষ্ঠাতারা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন এবং বড় অংশের লাভও পেতে পারেন।
যখন ঋণ নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি এ এফ নেসারউদ্দিন বলেন, কিছু বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বড় ঋণ পাওয়ার জন্য প্রকল্পের প্রকৃত মূলধন দেখানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম করে।
তার মতে, কোনো প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, সেটিকে ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে ৩০ শতাংশ নিজস্ব বিনিয়োগ দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে কাগজে মূলধন থাকলেও বাস্তবে তা নাও থাকতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকেরও দায়িত্ব রয়েছে। ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু কখনো কখনো বড় ঋণ অনুমোদনের জন্য প্রকল্পের মূল্যায়ন অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে যায়।
মামুন রশীদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশে একটি প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক থেকে আসতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাংকের অংশ অনেক বেশি। এর ফলে ব্যবসায়ীদের নিজেদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও কমে যায়।
তিনি মনে করেন, কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যেমন ব্যাংকের জন্য একক গ্রাহক ঋণ সীমা রয়েছে।
তার মতে, ব্যাংকের উচিত শুধু জামানত দেখে ঋণ না দিয়ে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, আয় তৈরির ক্ষমতা এবং ব্যবসার সক্ষমতা বিবেচনা করা।
ঋণের আসল চাপ আসে পরে
ব্যবসা যখন দ্রুত বাড়ে এবং নগদ অর্থ প্রবাহ ভালো থাকে, তখন বড় ঋণ খুব একটা সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালে সেই ঋণের চাপ সামনে আসে।
জুনের শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এদিকে তালিকাভুক্ত ১৬৬টি কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের অর্থায়ন ব্যয় প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ৮৭১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরীর মতে, বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে।
তার মতে, এতে প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে টিকে যায়, কিন্তু প্রকৃত সমস্যা সমাধান হয় না।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সভাপতি সাব্বির আহমেদ মনে করেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের আগে টেকসই সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজন
বিশ্বের অনেক দেশই ঋণনির্ভর অর্থায়নের ঝুঁকি মোকাবিলা করেছে। ইন্দোনেশিয়াতেও এশীয় আর্থিক সংকটের সময় অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বড় সমস্যা তৈরি করেছিল।
পরবর্তীতে দেশটি অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করে। ২০০৭ সালের মধ্যে করপোরেট অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে আসে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের ভারসাম্য।
শুধু পুঁজিবাজার নয়, করপোরেট বন্ড এবং ইসলামিক অর্থায়নের সুকুকের মতো মাধ্যমও দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের বিকল্প হতে পারে।
মালয়েশিয়া দেখিয়েছে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী মূলধন বাজার তৈরি করা যায়। ২০২৫ সালে দেশটির মূলধন বাজারের আকার ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন রিঙ্গিত ছাড়িয়েছে এবং বন্ড ও সুকুক বাজারও সক্রিয় রয়েছে।
তবে এর পেছনে শুধু একটি বাজার নয়, বরং বিনিয়োগকারী আস্থা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।
সিটি গ্রুপও বড় ব্যাংক ঋণের চাপের পর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পুঁজিবাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি, বেসরকারি মূলধন, অগ্রাধিকার শেয়ার, করপোরেট বন্ড বা সুকুকের মতো মাধ্যম থাকতে পারে।
ব্যাংক ঋণ কখনোই খারাপ নয়। বরং ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন একটি দেশের ব্যবসায়িক অর্থায়নের প্রায় পুরো ব্যবস্থা একটি পথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ব্যবসার প্রয়োজন কম ঋণ নয়; প্রয়োজন আরও বেশি অর্থায়নের পথ।
কারণ একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন ব্যবসাগুলো শুধু ব্যাংকের দরজায় নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উৎসের কাছেও যেতে পারে।

