১৯৬২ সালে জামালগঞ্জে প্রথম কয়লা খনি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের যাত্রা শুরু। তখন থেকেই বাংলাদেশের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের অপার সম্ভাবনা উন্মোচিত হতে থাকে। শুধু কয়লা নয় আমাদের দেশে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, গ্রানাইট এবং পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ। এসব খনিজ সম্পদ অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে, যদি এর সঠিক ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমান এই আধুনিক বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য উন্মুক্ত কয়লা খনির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি একটি দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবিক প্রভাব অনেকটাই ভিন্ন। উন্মুক্ত কয়লা খনি পরিবেশ এবং মানবজীবনের উপর রেখে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব। প্রকৃতি, পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা- সবকিছুকে আঘাত করে চলেছে এই খনি কার্যক্রম।
১৯৯৭ সালে বহুজাতিক বিএইচপি ফুলবাড়ি কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কার করার পর দেশের কয়লা খনি খাত নতুন দিগন্তে পা রাখে। এরপর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি যা বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান কয়লা উৎপাদন খনি ও চীনের সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়ামের সাথে যৌথভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু হলেও এই খনির কার্যক্রম শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয় বরং পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
উন্মুক্ত কয়লা খনি বা ওপেন-কাস্ট খনি পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হয় ভূমির গভীরে না গিয়ে সরাসরি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে। এই পদ্ধতিতে কার্যতঃ বিশাল এলাকা খনন করে বিপুল পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা হয়। তবে এর সাথে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকিও জড়িত। পরিবেশবিদরা জানান উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে বৃক্ষরাজি ধ্বংস, ভূমির ক্ষয়, পানি দূষণ এবং বায়ু দূষণের মত মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়।
ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ী- জমি অধিগ্রহণের জন্য ৪২.৩৪ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি ব্যবহার করা হবে, যা স্থানীয় কৃষি জীবনের জন্য একটি বড় বিপদ। এই জমির মধ্যে রয়েছে তিন ফসলি জমি। যা একবার কয়লা উত্তোলনের জন্য ব্যবহার হলে তার উপরের স্তরের মাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মধ্যে প্রায় ১৯.৪৬ বর্গকিলোমিটার জমিতে মাটি জমা করার জন্য “ওভার বার্ডেন” এবং ৬.৯৬ বর্গকিলোমিটার জমিতে জলাধার তৈরি করা হবে। যার ফলে মোট ২৬.৪ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এই বিশাল জমির ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদী। কারণ মাটির উর্বরতা ফিরে পেতে অনেক দীর্ঘ বছর লেগে যেতে পারে।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির মতো খনি যখন উন্মুক্তভাবে পরিচালিত হয় তখন এটি এলাকার কৃষি ভূমি, পানির উৎস এবং জনজীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। নদী ও জলাশয়ে দূষণ ঘটিয়ে মাছ ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। একইভাবে খনির ধূলিকণায় দূষিত বাতাস স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। বরং এর ফলে বিষাক্ত গ্যাস ও ধূলিকণার কারণে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন: অ্যাজমা, ক্যান্সার এবং ব্রঙ্কাইটিস।
এছাড়া কয়লা উত্তোলনকারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়শই দুর্ঘটনা, ভূমিধস ও অন্যান্য বিপদ ঘটতে দেখা যায়। খনি এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের জীবনযাত্রাও বিপন্ন হয়ে পড়ে। কারণ তাদের জীবনধারণের জন্য অবলম্বনযোগ্য কৃষি ও জলজ সম্পদ ক্রমশঃ কমে যায়। এছাড়া এই খনির কার্যক্রমের কারণে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু স্থানীয় জলাশয় ও নদীতে প্রবেশ করে। এর ফলে শুধুমাত্র পানীয় জলের সংকট নয়, বরং জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়।
উন্মুক্ত কয়লা খনির কার্যক্রম থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং মিথেন গ্যাস পরিবেশে ছড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায়। এই গ্যাসগুলো গ্রিনহাউস প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। যা উষ্ণায়ন, খরা এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলে। শুধু স্থানীয় নয় এই দূষণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নেও অবদান রাখে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে দেশের তেমন কোনো বিকল্প না থাকায় এখনও বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নয়। বরং দেশটির জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই শক্তি উৎপাদনের অন্য অনেক বিকল্প রয়েছে।
বাংলাদেশের শক্তির চাহিদা মেটাতে গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। দেশের ভৌগলিক এবং সাগরের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিশেষভাবে সুবিধাজনক।যা তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই শক্তি উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি উন্নত হয়েছে এবং সাশ্রয়ীও।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়লা, এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) এবং রেন্টাল কুইক-রেন্টাল শক্তি উৎপাদনে নির্ভরশীলতার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। যা শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং আর্থিকভাবেও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। কয়লা এবং এলএনজি পরিপূরক হওয়ার বদলে দেশের অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলতে পারে। কারণ এর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ এবং সময় ব্যয় করা হলেও, সেই বিনিয়োগের সুফল তেমনভাবে অর্জিত হবে না।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে- যতটুকু পরিমাণ অর্থ এবং সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিছনে ব্যয় করা হচ্ছে, ততটা কি নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশে ব্যয় করলে আমাদের দেশের শক্তির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না? আজকের বাস্তবতা হল- জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে এখনই পরিবর্তন না আনা গেলে, তা ভবিষ্যতে আমাদের জন্য বিপদজনক হতে পারে। এই ব্যপারে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতার বৃদ্ধি এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও সমাধানের পথে সহায়ক হতে পারে। পরিবেশ ও জীবনের সুরক্ষায় টেকসই উন্নয়নের এই ধাপগুলো অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, উন্মুক্ত কয়লা খনির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা নিরন্তরভাবে পরিবেশের উপর ভারী প্রভাব ফেলছে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। এই অবস্থায় আমাদেরকে বুঝতে হবে যে প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে আপোস করে করা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের সকলের। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে আমাদের জন্য সুস্থ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথে প্রথম পদক্ষেপ।

