সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই জটিল করছে না, এর অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্স, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি ও সার আমদানি, পণ্য রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি সৌদি আরবের শ্রমবাজার। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া প্রায় ৯৬ লাখ বাংলাদেশির প্রায় অর্ধেকের কর্মসংস্থান হয়েছে সৌদি আরবে। ফলে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিলে নতুন কর্মী নিয়োগে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মী নিয়োগ বিলম্বিত হতে পারে, বিদেশযাত্রার খরচ বাড়তে পারে এবং শ্রমিকের চাহিদাও কমে যেতে পারে।
তার হিসাবে, প্রতিবছর অন্তত ৮ লাখ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। এই প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা এলে নতুন অভিবাসী কর্মীদের পাশাপাশি তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ৯ লাখ ৬৯ হাজার কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ লাখের বেশি কর্মী নিয়েছে সৌদি আরব, যা মোট বিদেশগামী কর্মীর ৬০ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্সেও সৌদি আরবের ভূমিকা বড়। গত বছর মোট রেমিট্যান্সের ১৬ শতাংশ এসেছে দেশটি থেকে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিরা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা ওই সময়ের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
তবে সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর এখনো রেমিট্যান্স প্রবাহে সরাসরি কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। আলী হায়দার চৌধুরী মনে করেন, প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের মোট অভিবাসী কর্মীর তিন-চতুর্থাংশের বেশি উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন। ফলে ওই অঞ্চলের সংঘাত শুধু সৌদি আরব নয়, বাংলাদেশের পুরো বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলে নতুন করে কাজের জন্য বাংলাদেশিদের যাওয়ার সংখ্যাও কমেছে।
সাম্প্রতিক হুতি হামলার কারণে ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী অন্তত ৬১টি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি বড় ঝুঁকি জ্বালানি ও সার আমদানি। হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে জাহাজ চলাচলে হুমকি বাড়ালে বাংলাদেশগামী পণ্যবাহী জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হতে পারে।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতেও বাণিজ্যিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেখানে সমস্যা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও সারের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৬ ডলার থাকতে পারে। ২০২৫ সালে এই গড় ছিল ৬৮ ডলার।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের নিট আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। এর সঙ্গে গ্যাস ও সারের দাম বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয় সামাল দিতে এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার চলতি অর্থবছরে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
তবে সার আমদানিতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব থেকে সারের চারটি চালান ইতোমধ্যে এসেছে এবং পঞ্চম চালান বন্ধ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
সৌদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সেখানে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি হলে ওমানের দুকম বন্দর ব্যবহার করে সার পাঠানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সচিব রিয়াজ উদ্দিন আহমেদও বলেছেন, সাম্প্রতিক হামলার কারণে এখন পর্যন্ত আমদানিতে বড় সমস্যা দেখা যায়নি। তবে বাব এল-মান্দেব এলাকার পরিস্থিতির কারণে জাহাজগুলো বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।
সৌদি আরব শুধু বাংলাদেশের শ্রমবাজার নয়, তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় ইতোমধ্যে বেড়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী আহসান খান চৌধুরী জানিয়েছেন, আগে তারা হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠাতেন। এখন বিকল্প পথে কনটেইনার পরিবহন করা হচ্ছে।
এর ফলে প্রতি কনটেইনারের পরিবহন ব্যয় ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে কোম্পানিটির লাভের হার প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ কমিয়ে চীন থেকে আমদানি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে তাদের ক্রয়াদেশ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে এবং রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল করছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ হুতি হামলার কারণে বাংলাদেশের সামনে চারটি প্রধান ঝুঁকির কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে বিঘ্ন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং বাব এল-মান্দেব এলাকায় হামলা বাড়লে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি।
ব্যবসায়িক সংগঠন বিল্ডের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম মনে করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও ডলার তারল্য ধরে রাখা, রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা, বন্দর ও শুল্ক প্রক্রিয়ার জটিলতা কমানো এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা দরকার।
সৌদি আরবে চলমান হামলা এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পূর্ণমাত্রার ধাক্কা দেয়নি। কিন্তু ঝুঁকিগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সৌদি শ্রমবাজার দুর্বল হলে রেমিট্যান্স কমতে পারে, জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে রপ্তানিকারকের প্রতিযোগিতা দুর্বল হবে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু একটি দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক সংকট থাকবে না। এটি ধীরে ধীরে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা, মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে।

