সমুদ্রের ঢেউ দেখতে মানুষ কক্সবাজার যায়, পাহাড়ের সবুজে হারিয়ে যেতে যায়, হাওরের জলে প্রকৃতির সান্নিধ্য খুঁজতে যায়। পরিবার নিয়ে কয়েকটি আনন্দময় দিন কাটানোর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা যদি পরিণত হয় স্বজনের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরার দুঃস্বপ্নে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে ‘আমাদের পর্যটনব্যবস্থা আসলে কতটা নিরাপদ’?
কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা কেবল একটি স্থাপনার দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনিক তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের কার্যকারিতা নিয়েই যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন শুধু শোক প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ থাকে না।
নিয়ম আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?
বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের বিস্তার ঘটছে। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, সুন্দরবন কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওর সহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্র। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের সমানতালে উন্নতি ঘটছে কি?
একটি পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকা কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।
বিশেষত কাঠ, বাঁশ, ছন কিংবা অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সেখানে পর্যাপ্ত বিকল্প বহির্গমনপথ না থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ছোট আগুনও ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটকদের কাছ থেকে রাতপ্রতি হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয় যে স্থাপনাগুলোতে, সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ কতটা দায়িত্বশীল? আর সরকারি অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোই বা কী করছে?
সতর্কবার্তা দেওয়াই কি প্রশাসনের শেষ দায়িত্ব?
কোনো স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলো, নোটিশ দেওয়া হলো, জরিমানা করা হলো কিন্ত তারপরও যদি সেখানে মানুষের বসবাস ও ব্যবসা চলতে থাকে, তাহলে সেই সতর্কতার কার্যকারিতা কোথায়?
নিরাপত্তার ঝুঁকি শনাক্ত করার উদ্দেশ্য দুর্ঘটনার পর প্রতিবেদন তৈরি করা নয়; দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রাণহানি ঠেকানো। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি বিপজ্জনক কার্যক্রম বন্ধ না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা, সমন্বয় ও দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
কক্সবাজারের ঘটনার মতো বিপর্যয় সামনে এলে এক সংস্থা অন্য সংস্থার দায়িত্বের কথা বলতে পারে। কেউ বলতে পারে, স্থাপনা বন্ধ করার ক্ষমতা তার নেই; অন্য কেউ বলতে পারে, অনুমোদন দেওয়া তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো বিচ্ছিন্ন দপ্তরের সমষ্টি নয়। মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সামগ্রিক। বিশেষ করে গত দশ মাসে ছয়টি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তাই দায়িত্বশীল দের ভূমিকার মূল্যায়ন করাও জরুরী।
কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা একটি সংস্থার হাতে থাকলেও ঝুঁকির তথ্য অন্য সংস্থার কাছে থাকার পর সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়ার দায় এড়ানো যায় না। দায়িত্বের বিভাজন যেন দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।
ব্যবসার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ে নয়
পর্যটনশিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ, পরিবহন, খাবার, আবাসন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসারে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ব্যবসার স্বাধীনতা কখনোই মানুষের জীবন বিপন্ন করার স্বাধীনতা হতে পারে না।
একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন, মুনাফা অর্জন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যয় কমিয়ে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবহার করে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা অপরাধমূলক অবহেলায় পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে, নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাওয়া উদ্যোক্তারা যদি বিভিন্ন দপ্তরের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির শিকার হন, অথচ নিয়ম না মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালাতে পারে, তাহলে বৈধ ব্যবসার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সৎ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং অনিয়মের জন্য একটি অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
অতএব, সমাধান শুধু অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ানো নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ ও সমন্বিত অনুমোদনব্যবস্থা এবং নিয়ম ভাঙলে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা।
দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ
বাংলাদেশে বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সাধারণত কয়েকটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়—শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ঘোষণা এবং কিছুদিন পর ঘটনাটি জনআলোচনা থেকে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো কি না, একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করা হলো কি না, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই জনসমক্ষে স্পষ্ট থাকে না।
এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
প্রথমত, পর্যটনকেন্দ্রের সব হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও হাউসবোটের নিরাপত্তা যাচাই করে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী তালিকা প্রকাশ করতে হবে। যেসব স্থাপনায় তাৎক্ষণিক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় বন্ধ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনপথের বিষয়টি শুধু কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বাস্তব মহড়া, সরেজমিন পরিদর্শন এবং আকস্মিক তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যটক যেন নিজের কক্ষ থেকে নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দায়িত্ব ও ক্ষমতার অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। কোথাও গুরুতর ঝুঁকি শনাক্ত হলে কোন সংস্থা কত সময়ের মধ্যে কী ব্যবস্থা নেবে, তা সুস্পষ্ট নীতিমালায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, দুর্ঘটনার পর তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর। স্থাপনার মালিক, ব্যবস্থাপক, অনুমোদন প্রদানকারী কর্মকর্তা কিংবা তদারকিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পদ, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব যেন জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল না হয়।
পঞ্চমত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
পর্যটকের নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়
একটি দেশের পর্যটনশিল্পের সাফল্য শুধু কতজন পর্যটক এলেন, কতটি রিসোর্ট তৈরি হলো কিংবা কত টাকা আয় হলো তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে পর্যটক কতটা নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারছেন, স্থানীয় মানুষ কতটা উপকৃত হচ্ছেন এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকছে তার ওপর।
পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য প্রচারে আমরা যতটা আগ্রহী, সেই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা নিরাপত্তাঝুঁকি দূর করতেও ততটাই আন্তরিক হতে হবে। কারণ একটি পরিবারের কাছে ছুটি কাটানোর অর্থ শুধু অর্থ ব্যয় করে আনন্দ কেনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রিয়জনের নিরাপত্তা এবং সুস্থভাবে ঘরে ফেরার প্রত্যাশা।
ইনানীর অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির দায় নির্ধারণ করতে হলে তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি সিদ্ধান্ত, অবহেলা ও সম্ভাব্য ব্যর্থতার চিত্র সামনে আনতে হবে। কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
মনে রাখতে হবে, একটি রিসোর্টের আগুন নিভে যেতে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা আবার নির্মাণ করা যেতে পারে, পর্যটকের ভিড়ও একসময় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যাঁরা প্রাণ হারান, তাঁদের আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
তাই কে আগুন লাগিয়েছিল তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো, আগুন লাগার পর মানুষ বের হতে পারলেন না কেন? ঝুঁকি আগে থেকে জানা থাকলে তা দূর করা হলো না কেন? আর যাঁদের দায়িত্ব ছিল এসব নিশ্চিত করা, তাঁদের জবাবদিহি কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চিত না হলে পর্যটনশিল্পের প্রবৃদ্ধির আড়ালে নিরাপত্তাহীনতার সংকট থেকেই যাবে। মানুষকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়ার নামে তাঁদের মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পর্যটন মানুষের আনন্দের জায়গা হবে, মৃত্যুফাঁদ নয়।

