“বাবা, তুমি কখন আসবা?” সাত বছরের রামিসা আক্তারের এই ছোট্ট ডাকটি আর কখনো শোনা যাবে না। ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে একটি সাধারণ ফ্ল্যাট এখন শুধু নিস্তব্ধতায় ভরা। দু’দিন আগেও যেখানে হাসির ঝলকানি, পড়াশোনার কলরব আর বাবাকে ফোন করার অপেক্ষা ছিল, সেখানে এখন শুধু শোকের ছায়া।
রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত সোমবার (১৮ মে) রাত পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল তার কিন্তু আর খুঁজে পাওয়া গেল না ছোট্ট মেয়েটিকে। মায়ের সন্দেহ হলো—পাশের ফ্ল্যাটে হয়তো খেলতে গেছে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরদিন মঙ্গলবার সকালে স্বজনদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যা দেখা গেল, তা কল্পনার বাইরে। মস্তকবিহীন দেহ পড়ে ছিল রামিসার।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে ভয়ংকর বিবরণ। শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়, শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। তারপর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং শরীর টুকরো করার চেষ্টা চলছিল। প্রধান অভিযুক্ত প্রতিবেশী সোহেল রানা। ঘটনার মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযুক্তের আচরণ বিকৃত যৌন প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমি বিচার চাই না… আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও তো আর ফিরে আসবে না।
একজন বাবার এই অসহায় আকুতি শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং সমাজের এক ভয়ংকর বাস্তবতার প্রতিফলন। গত দশ দিনে অন্তত চারজন শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক অবক্ষয়, আইনের দুর্বলতা, নৈতিক অবনতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটের সম্মিলিত প্রভাব।
রামিসার মা স্বপ্না আক্তারের চোখের সামনে এখনো হয়তো ঘুরছে মেয়ের হাসিমুখ। আর পুরো দেশের অভিভাবকদের মনে একই প্রশ্ন জাগছে—আমাদের সন্তানেরা কতদিন নিরাপদ থাকবে? এই নৃশংসতার বিচার হোক দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু বিচারের পরেও প্রশ্ন থেকে যায়—এমন ঘটনা বন্ধ করতে আমরা সমাজ হিসেবে কী করছি?
রামিসা, তোমার ছোট্ট ডাকটি হয়তো আর ফিরবে না কিন্তু সেই ডাক যেন সমাজের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। সমাজে জঘন্য অপরাধ বাড়ার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, মাদক সেবন, অপরাধ প্রবণতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ না হলে এবং কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তবে শক্তিশালী ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থাকলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই অপরাধ থেকে বিরত থাকেন।
গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি মদিনা পাড়া গ্রামে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শিশুটির সৎ মামা রাজা মিয়াকে (৩৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দিনাজপুরে আরেক ঘটনায় ১২ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী ৬৫ বছর বয়সী নূর ইসলাম শিশুটিকে ধর্ষণ করে।
এর আগে গত ৬ মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শিশুটির প্রতিবেশী ও দূরসম্পর্কের চাচা জাকির হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিহত ফাহিমা সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। ৮ মে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার দুই দিন আগে সে নিখোঁজ হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ফাহিমা প্রতিবেশী চাচা জাকিরের ঘরে গেলে তাকে ২০ টাকা দিয়ে দোকান থেকে সিগারেট আনতে পাঠানো হয়। সে ফিরে আসার পর ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। পরে অজ্ঞান হয়ে পড়লে গলা টিপে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হত্যার পর লাশ খাটের নিচে সুটকেসে লুকিয়ে রাখা হয় এবং পরে দুর্গন্ধ ছড়ালে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, আইনের প্রয়োগ দুর্বল হলে বা কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবলে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ে। তবে শক্তিশালী ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থাকলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ অপরাধ থেকে বিরত থাকে। তিনি আরও বলেন, শিশু নির্যাতন বা যৌন সহিংসতা একক কোনো কারণে ঘটে না। এটি একটি বহু উপাদান নির্ভর সমস্যা। ব্যক্তির মানসিক গঠন, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বেড়ে ওঠা, আসক্তি ও আচরণগত সমস্যা মিলেই অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয়।
প্রতিরোধের উপায় হিসেবে তিনি তিনটি দিককে গুরুত্ব দেন—কার্যকর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার, সামাজিকভাবে অপরাধের কঠোর নিন্দা এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষা। তার মতে, শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ শুরু হয় পরিবার ও শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় আচরণগত সমস্যা শনাক্ত করে কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা দিলে ভবিষ্যতের অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি এসব অপরাধের ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক ঘটনার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে, আবার কিছু ঘটনার বিচারই হয় না। বছরের পর বছর কেটে যায় কিন্তু রায় আসে না। একই সঙ্গে শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, বিচার প্রক্রিয়া যত বেশি বিলম্বিত হবে, শিশুর প্রতি সহিংসতার ঝুঁকি তত বাড়বে। কারণ আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, এমন অপরাধ রোধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন জরুরি। রাষ্ট্রের আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
সোহেল রানার স্বীকারোক্তি, স্ত্রী কারাগারে:
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
গতকাল বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে সোহেল রানা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে সম্মতি জানান। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা তার জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। আদালত আবেদন গ্রহণ করে তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আরেক ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুই আসামিকেই আদালতে হাজির করে পৃথক আদালতে পৃথক আবেদন দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, সোহেল রানা শিশুটিকে টয়লেটে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে এবং পরে তাকে গলা কেটে হত্যা করে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে।
‘বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না’:
নিহত শিশু রামিসা আক্তারের বাবা আবদুল হান্নান মোল্লার কান্না আর আক্ষেপে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। তিনি গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি আর বিচার চান না। তার মতে, দেশে বিচার হয় না, বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। তিনি বলেন, তার বিশ্বাস বিচার খুব বেশি হলে কয়েকদিন চলবে, এরপর আরেকটি ঘটনা ঘটবে এবং আগের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে। তাই তিনি বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
আবদুল হান্নান মোল্লা বলেন, তার মেয়ে রামিসা ছিল পরিবারের প্রাণ। তাকে দিনে ৫০ থেকে ১০০ বার ফোন করে জিজ্ঞেস করত—‘বাবা তুমি কখন আসবা’। এখন সেই ফোন আর আসবে না, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, শিশুটি ঘরে ঢোকার আগে বাবার জন্য শরবত বানিয়ে রাখত। সেই স্মৃতি তাকে আরও ভেঙে দিচ্ছে। তিনি বারবার প্রশ্ন করেন, তার সন্তানের অপরাধ কী ছিল।
এদিকে ঘটনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন রামিসার মা পারভিন বেগম। কখনো জ্ঞান ফিরলে তিনি শুধু একটাই প্রশ্ন করছেন—‘আমার রামিসা কোথায়’। আবার কখনো বলছেন, তার মেয়ে স্কুলে যাবে, খাবে, কিন্তু সে তো একা খেতে পারে না। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং পরে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটি স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুমে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। মরদেহ গোপন করতে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং দেহ টুকরো করার চেষ্টা করা হয়। তবে ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় সেই চেষ্টা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ আরও জানায়, মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মিরপুরের মিল্লাত ক্যাম্প এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যেই মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তে আরও জানা যায়, সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলাও রয়েছে। পুলিশের ধারণা, শিশুটির সঙ্গে নৃশংসতার সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পর তাকে হত্যা করা হয় এবং পরে মরদেহ গোপনের পরিকল্পনা করা হয়। অভিযুক্তের আচরণে বিকৃত মানসিকতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
রামিসার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠছে, সেটাই যেন এখন পুরো সমাজের প্রশ্ন—একটি আট বছরের শিশুর হাসি, স্বপ্ন আর বাবার জন্য রেখে যাওয়া শরবত বানানোর ভালোবাসা কি সত্যিই এভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে? যদি একটি শিশু ঘরের ভেতরেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়? আর এমন নির্মম ঘটনার পরও যদি শুধু কান্না আর প্রতিশ্রুতিই থেকে যায়, তবে পরের রামিসার অপেক্ষায় কি আমরা অজান্তেই দাঁড়িয়ে আছি?
সিভি/এম

