দেশি ও বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক চাপে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, তখন আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে উঠেছে নতুন আলোচনা। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই সময় বড় বড় লক্ষ্য বা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার চেয়ে বেশি জরুরি হলো সাধারণ মানুষ, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমানো এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার বাস্তবায়ন।
তাঁদের মতে, বর্তমানে বিনিয়োগ আস্থা দুর্বল, আর্থিক খাত অস্থির এবং বৈদেশিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। এই অবস্থায় বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত “স্বস্তি দেওয়া” এবং “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা”।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদদের সতর্ক বার্তা: প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত প্রাক-বাজেট গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আগামী বাজেটকে অবশ্যই চারটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেগুলো হলো—
- দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা
- আর্থিক খাতের দুর্বলতা
- জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা
- বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার ঘাটতি
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই আগামী বাজেটকে হতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য এবং কার্যকর। তিনি আরও বলেন, সংকট মোকাবিলায় শুধু আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অতীতের ডেল্টা প্ল্যানের মতো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, সরকারি খরচের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনপ্রিয় বাজেট নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেটই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ধীর। এটি অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। যদিও অর্থমন্ত্রী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন, তবুও সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার বিভিন্নভাবে চলছে। কোথাও সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ হচ্ছে, আবার কোথাও নীতিগত কৌশল যেমন ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দুর্নীতি হচ্ছে। এছাড়া প্রশাসনিক হয়রানিকে তিনি পুরনো “লাইসেন্স রাজ” ব্যবস্থার অবশিষ্ট রূপ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা এখনো দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখছে।
বাজেটে ভারসাম্যের আহ্বান:
গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তবে বাজেট তৈরি করতে হবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শুধু দেশীয় নয়, বৈশ্বিকও। তাই অর্থমন্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, আগামী বাজেটে তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত—
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
- বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল রাখা
- উচ্চ সুদের হার মোকাবিলা
তিনি আরও জানান, বাজেট ঘাটতি যদি প্রায় ৪ শতাংশের মধ্যে থাকে, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনও বড় সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে কর ছাড় ও ভর্তুকির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার কর ছাড় এবং ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকার ভর্তুকি রয়েছে। তিনি আরও পরামর্শ দেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে বাজারে দক্ষতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো আর্থিক খাতের চাপ ও অস্থিরতা। ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনই আর্থিক খাতের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাঁর মতে, সংস্কার প্রয়োজন, তবে সেটি হতে হবে সঠিক ও কার্যকর। তিনি বলেন, বর্তমান অনেক সমস্যা আগের সরকারের নীতি ও কাঠামোর কারণে তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কর ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো করের বোঝা বাড়ানো নয়, বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করা। তার প্রস্তাব অনুযায়ী—
- কর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা দরকার
- ভ্যাট হার একক করা উচিত
- বর্তমান করজিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ শতাংশ, যা বাড়াতে হবে
তিনি আরও বলেন, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে অন্তত ৩ শতাংশ করা উচিত, কারণ এটি সাধারণত ফেরত পাওয়া যায় না। এছাড়া উৎসে করের হারও কমানো প্রয়োজন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল। তাই বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করলেও রপ্তানিকারকেরা তা ফেরত পাচ্ছেন না, যা শিল্প খাতে বড় চাপ তৈরি করছে। তিনি কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতির দাবি জানান।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় সুযোগ রয়েছে। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, আমদানি শুল্ক বেশি হওয়ায় লবঙ্গ, এলাচসহ মসলা এবং ফলের দাম বেড়ে গেছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সাবেক পরিচালক সেলিম জাহান বলেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। টিকে গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, উচ্চ সুদের কারণে বাংলাদেশ চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এসব দেশে ঋণ পরিশোধের সময়ও বেশি, যা বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রবেশ করায় ছোট ব্যবসা ও স্থানীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বড় কোম্পানিগুলো কম দামে প্যাকেটজাত চাল বিক্রি করছে, অথচ কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী বাজেটে নিম্ন আয়ের বিভিন্ন পেশাজীবী যেমন জুতা নির্মাতা, কুমার, শিল্পী, কারুশিল্পী ও চিত্রশিল্পীদের বাজেট কাভারেজে আনা হবে। তিনি জানান, এসব খাতে সহায়তার জন্য বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওকে যুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যবসা সহজীকরণে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে এবং সৃজনশীল অর্থনীতি ও ক্রীড়া অর্থনীতিকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত স্পষ্ট—আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তব সংকট মোকাবিলা, না যে বড় প্রতিশ্রুতি। এখন প্রয়োজন অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ আস্থা বাড়ানো এবং টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন করা।

