বাংলাদেশে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, মানুষের আয়-রোজগারের পথও বাড়ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় চিত্র সামনে এসেছে—বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪–এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ বা ৭৬ লাখ প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের নিবন্ধনের আওতায় নেই। অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া প্রায় ৭ শতাংশ বা সাড়ে ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা নেই।
এই তথ্য দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে বিপুল সংখ্যক ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসা, যারা নিজেদের মতো করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠান, যারা ব্যাংকঋণ, সরকারি সহায়তা ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনা করলে অনিবন্ধিত ব্যবসার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তবে কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫৪ শতাংশ সৃষ্টি করেছে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো, যদিও তাদের সংখ্যা মাত্র ২৮ শতাংশ। বিপরীতে, প্রায় ৬৫ শতাংশ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তুলনামূলক বড় আকারের এবং সেখানে বেশি মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র দোকান, পারিবারিক ব্যবসা, কুটির শিল্প বা ছোট পরিসরের উদ্যোগ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি ব্যবসা যখন আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসে, তখন তার বিকাশের সুযোগ বাড়ে। ব্যাংকঋণ পাওয়া সহজ হয়, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় এবং ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ এখনো গ্রামকেন্দ্রিক। শুমারিতে দেখা গেছে, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৬৩ শতাংশ বা প্রায় ৭৪ লাখ প্রতিষ্ঠান গ্রামে অবস্থিত। অন্যদিকে শহরে রয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ৪৩ লাখ প্রতিষ্ঠান।
তবে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও গ্রামে কর্মসংস্থানের পরিমাণ শহরের তুলনায় খুব বেশি নয়। এর প্রধান কারণ হলো, শহরের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আকারে বড় এবং সেখানে কর্মীর সংখ্যাও বেশি।
শহরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৯৯ লাখ মানুষ। অন্যদিকে গ্রামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ, যেখানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ।
অন্যদিকে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্রামের আধিপত্য বেশি। গ্রামে প্রায় ৫২ লাখ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ। শহরে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ, যেখানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, গ্রামের অর্থনীতি মূলত ছোট ও পারিবারিক উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করলেও বড় পরিসরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকা সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ হচ্ছে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও পরিবারভিত্তিক ব্যবসা। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অনেক সময় মনে করেন, নিবন্ধন করলে তাদের খরচ বাড়বে এবং বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলার চাপ তৈরি হবে।
অনেক ছোট উদ্যোক্তার মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যবসার সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তারা জানেন না যে নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যাংকঋণ, সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা, বিভিন্ন দপ্তরে আলাদা আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাও অনেক উদ্যোক্তাকে নিরুৎসাহিত করে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীরা অনেক সময় মনে করেন, তাদের ব্যবসার আকার এত ছোট যে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। ফলে তারা দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যেই থেকে যান।
বিপুল সংখ্যক ব্যবসা নিবন্ধনের বাইরে থাকার কারণে একদিকে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্ব।
নিবন্ধিত না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান সহজে ব্যাংকঋণ পায় না। ফলে তারা ব্যবসা বড় করতে পারে না, নতুন কর্মসংস্থানও সীমিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সঞ্চয় বা অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করে।
এ ছাড়া অনিবন্ধিত ব্যবসার কারণে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনীতির একটি বড় অংশ হিসাবের বাইরে থাকায় নীতিনির্ধারণেও সমস্যা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ব্যবসাকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা, রাজস্ব আয় এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হলে প্রথমেই প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসার প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন একটি সমন্বিত অনলাইন সেবার মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তার মতে, নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদের জামানতবিহীন ঋণ, শুরুতে কর ছাড় এবং সহজ করব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আসতে আগ্রহী হবেন।
অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিবন্ধনের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জন্য নিয়ম-কানুন মেনে চলার খরচ ও জটিলতা কমানো জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, ছোট ব্যবসার সংখ্যা বাড়ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলোকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
এর জন্য শুধু নিবন্ধনের চাপ সৃষ্টি করলেই হবে না; বরং উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ব্যবস্থা, আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সুবিধার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যদি ধীরে ধীরে নিবন্ধনের আওতায় আসে, তাহলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য তাই বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকেও আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির শক্তিশালী অংশ হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

